বাংলাদেশের ক্রসফায়ার ডকট্রিন

ডেস্ক রিপোর্ট :চলতি বছরের ২৬ মে একরামুল হককে গুলি করে হত্যার অডিও টেপটি যখন অনলাইনে ভাইরাল হয় তখন দুটি বিষয় সামনে আসে।

প্রথমত: এটি বাংলাদেশে চলমান বিচারবহির্ভুত হত্যকাণ্ডের একটি অকাট্য প্রমাণ।

অডিওতে শুনা যায়, অদূরে স্বামী ও পিতাকে গুলি করে হত্যার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন স্ত্রী ও সন্তানেরা। আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ঠুরভাবে গুলি করছে, অন্যদিকে একজন নিরপরাধ ব্যক্তি প্রাণভিক্ষার আকুতি জানিয়ে ঘাতকদের বলছেন যে তারা ভুল ব্যক্তিকে ধরেছেন। এটা এমন এক শব্দ যা একবার শুনলে কখনো ভোলা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, এই টেপ নিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী অবৈধ হত্যাকাণ্ড তদন্তে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন গঠন করেছে।

সরকারি হিসাবেই ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত দুই মাসের কম সময়ে ১৫৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী যাকে ‘ক্রসফায়ারে নিহত’ বলে উল্লেখ করে। এছাড়াও আরো বহু মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এদের অনেকের হদিস মেলেনি বা কোন অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা হয়েছে।

একরামুলকে হত্যা

পুলিশ কমিশনারের একজন সহকারি স্বরণ করেন, ‘একটি মামলা নিয়ে আলোচনার জন্য একরামুলকে টেলিফোনে স্থানীয় থানায় ডেকে পাঠানো হয়। তিনি একজন স্থানীয় নেতা। কোন তদন্ত কাজে তার সহায়তা নেয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। একরামুলমও ভেবেছিলেন যে আগের মতোই তাকে কোন সাহায্যের জন্য ডাকা হয়েছে।’

একরামুল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। ছাত্র অবস্থা থেকে দলটির সঙ্গে তিনি জড়িত। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি একজন সিটিং কাউন্সিলর।

ওই সহকারি বলেন, ‘সত্যিকারে বলতে কি এটা কিভাবে ঘটলো সে ব্যাপারে পুলিশেরও কোন ধারণা নেই। শুনেছি যে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা প্রথম নামটি একই এমন একজনকে খুঁজছিলো। একরামুলও এ কথা আটককারীদের বলেছে। কিন্তু তারা ভেবেছে যে একরামুল মিথ্যা বলছে। তাই তারা তাকে হত্যা করে।’

বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলেও হিটলিস্টে একরামুল হাসান নামে একজনের নাম থাকলেও একরামুল হকের নাম ছিলো না। হকের আটককারীরা একে ক্লারিক্যাল ভুল হিসেবে চালিয়ে দেয়। তারা যেকোনভাবে হত্যার অযুহাত তৈরি করে।

অডিও টেপ থেকে কমিশনারের সঙ্গে কথাব বলা বিষয়টিও প্রমাণিত হয়।

প্রথম ক্লিপে হকের স্ত্রী স্পষ্টভাবে বলতে শুনছেন: ‘আমাকে কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে দিন- আমি তার মিসেস বলছি – হ্যালো, কমিশনার সাহেব কি আছেন?’

হককে বলতে শুনা যায় যে সে তার ছোট মেয়েকে শুতে যেতে বলছে, থানার কাজ শেষ করতে তার অনেক দেরি হতে পারে।

সহকারি বলেন, ‘সত্যি কথা হলো, এ ব্যাপারে পুলিশের করার কিছুই ছিলো না। যেই সে আসে তখনই প্যারামিলিটারি ও গোয়েন্দারা তার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। কমিশনারেরও কথা বলার সুযোগ ছিলো না। তারা তাকে নিয়ে যায় এবং বাকিটা সবার জানা।’

হকের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে শুধু পুলিশ নয় মাদক নিয়ন্ত্রণ দফতরও নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখছে।

সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে হকের পরিবার অডিও টেপটি প্রকাশ করে এবং হককে একজন ভয়ংকর মাদক ব্যবসায়ী প্রমাণের জন্য এজেন্সিগুলোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তখন মাদক নিয়ন্ত্রণ দফতর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের কাছে হকের ব্যাপারে কোন ফাইল নেই এবং মাদকের সঙ্গে তার জড়িত থাকার বিষয়টি আমরা জানি না।’

এমন কি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও স্বীকার করেছেন যে: ‘চলমান মাদক-বিরোধী অভিযানে এক-দুটি ভুল হতেই পারে।’

কক্সবাজারের মাদক-বিরোধী আন্দোলনের এক কর্মী রাশেদ দিদারুল বলেন, ‘একরামুলের ভাই আশরাফুল আমাদের সঙ্গে নেশার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। তার পরিবার ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এটা দাবি করা সত্যিই হাস্যকর।’

ক্রসফায়ার ডকট্রিন

১৫৭টি হত্যাকাণ্ডের সবগুলো ঘটনায় তিনটি সংস্থা জড়িত: র‌্যাপিড এ্যাকশনা ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বাংলাদেশ পুলিশ, ও গোয়েন্দা বিভাগ। তারা বলছে যে এসব লোক ক্রসফায়ারে মারা গেছে।

প্রতিবারের একই গল্প, যা এমন: এজেন্সিগুলো কোন অভিযানে গিয়েছে। প্রতিপক্ষ এসময় গুলি চালালে এজেন্টরা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়। তখন মাঝে পড়ে লোকটি নিহত হয়। গল্পটির স্বপক্ষে প্রমাণ থাকে সামান্যই।

হকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাহিনী তৈরির চেষ্টা চালায় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু খুব কম মানুষ তা বিশ্বাস করেছে। অনেকেই হককে নিরস্ত্রভাবে স্বেচ্ছায় হাজির হতে দেখেছে। র‌্যাব এখন অডিও টেপের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করছে বলে জানায়- যার মানে হলো তাদেরকে খারাপ হিসেবে তুলে ধরতে এবং মাদক-বিরোধী যুদ্ধ কলংকিত করতে টেপটি তৈরি করা হয়েছে। এরপর র‌্যাবের পক্ষ থেকে আর কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি।

মানবাধিকার কর্মি এবং ঢাকার হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পরিচালক নুর খান বলেন, ‘এখন কোন যুদ্ধ চলছে না। আমরা একে সরকারি বাহিনীর ঠাণ্ডা মাথায় বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড বলতে পারি।’

সরকার যাদেরকে বিচারবহির্ভুতভাবে হত্যা করছে তাদের পরিবারকে আইনগত সহায়তা দিয়ে থাকে নুর খানের প্রতিষ্ঠান।

সরকার নুর খানকেও ট্রাবলমেকার বলে মনে করে। ২০১৪ সালের মে মাসে তাকেও একবার অপহরণের চেষ্টা করেছিলো গোয়েন্দারা।

‘ধরা যাক কেউ আসলেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারপরও বিচার ছাড়াই তাকে গুলি করে মেরে ফেলা কি ঠিক’, প্রশ্ন করেন খান।

রাষ্ট্রীয় নীতি বিচারবহির্ভুত হত্যা

ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রোদ্রিগো দুতার্তে তার দেশে যা করছেন তার সঙ্গে বাংলাদেশের মাদকবিরোধী অভিযানকে তুলনা করা যায়। তবে ক্রসফায়ার ডকট্রিনটি তার কাছ থেকে ধার করার প্রয়োজন নেই। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর অনেক আগ থেকেই বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ক্রসফায়ার ডকট্রিনকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

এমনকি ২০১৬ সালের জুলাইয়ে কুখ্যাত হলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডের অনেক আগ থেকে বিচারবহির্ভুত হত্যা ছিলো একটি নিয়মিত বিষয়। ইসলামাপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে শুরু করে ছাত্র আন্দোলন দমাতে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বিচারবহির্ভুত হত্যা।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান সরকার সন্ত্রাস-বিরোধী আইন করে ইসলামী জঙ্গিবাদ দমনের অযুহাতে। এই আইনে সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাবাদের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। যুদ্ধবিরোধী ট্রাইবুনালের সফলতার পর ২০১২ সালে সন্ত্রাসদমন আইন সংশোধন করে কোন সন্দেহভাজনকে বিচার ছাড়াই হত্যা ও আটক রাখার জন্য রাষ্ট্র ও প্যারামিলিটারি গ্রুপের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়।

২০১৬ সালে পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী আদেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অডিটবিহীন বাজেট এবং অপারেশন চালানোর নিরংকুশ স্বাধীনতা দেয়া হয়। ফলে তারা দায় মুক্তির সঙ্গে বিচারবহির্ভুত হত্যা চালিয়ে যেতে পারছে।

রাজনৈতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া

২০১৮ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের সহিংস রাজনীতিতে মাদক বিরোধী যুদ্ধ আরেকটি সহিংস জটিলতা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)’র ছাত্র সংগঠন-ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান বলেন, ‘হ্যা, এই দেশে ইয়াবা একটি প্রকট সমস্যা এবং এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নি:শেষ করে দিচ্ছে। এর বিস্তার কেউ মেনে নেবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো জিরো টলারেন্স বলতে কি বুঝায়? জিরো টলারেন্সকে বাস্তবে কিভাবে প্রয়োগ করা হবে? মাদকের অভ্যাস ছাড়াতে আপনি কি মানুষকে স্রেফ গুলি করে মেরে ফেলবেন, নাকি কোন আইনি কাঠামো তৈরি করে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি চালু করবেন?’

অনেক পর্যবেক্ষক, এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক জোট শরিকও মনে করে যে বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। মাদক-বিরোধী যুদ্ধকে ভোটারদের তুষ্ট করার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাসান আরো বলেন, মাদক বিরোধী অভিযানের নামে ক্রসফায়ারের আড়ালে সরকার রাজনৈতিক উইচ-হান্টও চালাচ্ছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরেই ‘ইয়াবা বুম’ তৈরি হয়। এতে তাদের নেতা-কর্মিরাই জড়িত। কিন্তু এখন পর্যন্ত বড় কোন ইয়াবা ব্যবসায়ী ক্রসফায়ারে মারা গেছে বলে শোনা যায়নি। একরামুল হকের ঘটনা একটি ব্যতিক্রম এবং সেও একজন মাঝারি মানের নেতা।’

গত মে মাসে মাদক নিয়ন্ত্রণ দফতরের একটি গোপন রিপোর্ট মিডিয়ায় ফাঁস হয়। এতে আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রহমান বদি এবং তার আত্মীয়-স্বজনকে ইয়াবা ব্যবসার গডফাদার হিসেবে অভিহিত করা হয়। মজার বিষয় হলো চলমান মাদকবিরোধী যুদ্ধে বদি ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ফাঁস হওয়া রিপোর্ট নিয়ে কাজ করা সাংবাদকিরা যখন নানাভাবে হুমকি পাচ্ছিলেন তখন জুলাইয়ের প্রথম দিকে বদি ও তার পরিবার সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে নিরাপদে দেশ ছেড়ে যায়।

ক্রাইসিস রিপোর্টিং বিষয়ে পুলিৎজার সেন্টারের দেয়া আর্থিক সহায়তায় এই রিপোর্ট তৈরি।