বঙ্গবন্ধুর চট্টগ্রাম

ফাইল ছবি

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রামকে অত্যাধিক ভালবাসতেন। তাই রাজনৈতিক অনেক বড় বড় চিন্তা বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের মাটিতেই ঘোষণা করেছেন। চট্টগ্রামকে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির ঘাটি হিসেবে বিবেচনা করতেন। এ জন্য তিনি বারবার এসেছেন চট্টগ্রামে। এর পেছনে চট্টগ্রামের রাজনীতির কিংবদন্তী মরহুম এম এ আজিজ ও জহুর আহমেদ চৌধুরীর অবদান পাহাড়সম। বঙ্গবন্ধুর অবিচল আস্থা ছিল এই দুই মহারথীর উপর, বিশ^স্থ সহচর ছিলেন তাঁরা। কিংবা বলা যায় বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষকে তাঁর নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করতেন।

চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের প্রতি অবিচল আস্থা থেকে ১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম লালদিঘী ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র, বাঙালী জাতির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬-দফা। চট্টগ্রাম ঢুকে যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। চট্টগ্রাম হয়ে উঠে মুক্তি আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, আন্দোলন সংগ্রামের পাদপীঠ।

আওয়ামী লীগের সূচনাতে বঙ্গবন্ধু যে কয়টি জেলার জেলা কমিটি গঠন করতে পেরেছিলেন তার মধ্যে চট্টগ্রাম অন্যতম। এম এ আজিজ আর জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ছিল সে কমিটি। কমিটি ঘোষণার পর চট্টগ্রাম আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ওই সময়ের রাজনীতি সম্পর্কে যারা জানেন তারা বুঝতে পারেন, তারা জানেন সে সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার মত বেশি লোক আওয়ামী লীগে তেমন ছিল না। সবাই মুসলিম লীগে ঘোরপাক খেতো ধান্দার জন্য। সে সময়ে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের কমিটি দিতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ঠিক কতবার চট্টগ্রামে এসেছেন সেটা আমার জানা নেই। তবে আলোচিত কয়েকটি সফর ও সে সফর উপলক্ষে আয়োজিত জনসভার বক্তৃতা থেকে বাংলার মানুষ খুঁজে পেয়েছিল রাজনীতির পথনির্দেশিকা।

১৯৬৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম শহরের স্থানীয় এক হোটেলে জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেন যে, একমাত্র গণতন্ত্রই সকল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। এ সম্মেলনে তিনি বলেন যে, তিনি নিজে গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পরস্পর বিরোধী নয়। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, আওয়ামী লীগের দাবী জনগণেরই দাবী এবং সকল শক্তির উৎস। জনগণের উপর তাঁর অগাধ বিশ^াস আছে ও তিনি কোন দিনই তাদের উপেক্ষা করিতে পারেন নি। বঙ্গবন্ধু তাঁর দলীয় কর্মসূচি অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে বিশ্লেষণকালে বলেন যে, ৬-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে প্রতিটি প্রদেশের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের অধিকার দিতে হবে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট অবশ্যই বিলোপ করতে হবে।

এদিন দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন যে, আমরা শান্তি চাই-দেশের মধ্যে এবং সমগ্র বিশে^র জন্যই আমরা শান্তি কামনা করি। তিনি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বপক্ষেও তাঁর মত ব্যক্ত করেন।

নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য কোন রাজনৈতিক দল বিশেষত বামপন্থী দলের সাথে ঐক্যজোট গঠনে আগ্রহী কিনা প্রশ্ন করা হলে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, তিনি দক্ষিণপন্থীও নহেন, বামপন্থীও নহেন এবং তাঁর দল সর্বদাই মধ্যমপন্থী। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন দেশে যেসব ডান-বামপন্থী দল আছে তাদের রাজনীতি এদেশের মাটি ও মানুষের মনের মধ্যে প্রোথিত নয়। এদের শেকড় অন্য কোথাও। তাই এদের কোন জনভিত্তি নেই। এদের সাথে জোট করলেও কোন লাভ হবেনা। গোলটেবিল বৈঠকে এদের অবস্থান ও ভূমিকা বঙ্গবন্ধুর কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

১৯৬৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু নোয়াখালীর চৌমোহনীতে কর্মী সমাবেশ করেন। তিনি সমাবেশে বন্যার তান্ডব হতে পূর্ব পাকিস্তানের ৬ কোটি মানুষের জীবন ও সম্পত্তির রক্ষার জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানান। তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রতি বছর উপর্যুপরি বন্যা প্রদেশের অসংখ্য অধিবাসীর প্রাণহানি ও বিপুল পরিমান সম্পত্তি নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সরকার প্রদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তিনি এক জনসভায় বলেছিলেন প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও সিন্ধুতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়, পক্ষান্তরে প্রতিবছর বন্যায় আক্রান্ত হওয়ার পরও পূর্ব বাংলায় বাঁধ নির্মাণ করা হয় না।

১৯৭০ সালের ২৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কুমিল্লা সফর করেন। কুমিল্লা শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দানে ভাষণ দানকালে তিনি বলেন, আইয়ুব-মোনেম সরকার এই দেশের জনগণকে গাধা বলে আখ্যায়িত করেছিল। কিন্তু সেই জনগণের নিকট তাদের মাথা নত করতে হয়েছে। তিনি বলেন, অত্যাচার ও অবিচারের জন্য জনগণ তাদের কোনদিনই ক্ষমা করবে না।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ জন নাগরিক হয়েও আমরা বিগত ২২ বৎসর ধরে শোষিত হয়েছি। যা কিছু ছিল উজাড় করে দিয়েছি। এখন আমাদের অধিকার আমরা আদায় করে নিতে চাই। সে জন্যই স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হয়েছে।পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মধ্যের অর্থনৈতিক বৈষম্যসহ সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, শিল্পপতি ট্যাক্স ফ্রি পায়। কিন্তু এ দেশের কৃষকের খাজনা, ট্যাক্সের জন্য হালের গরু ও অন্যান্য জিনিষপত্র ক্রোক করা হয়। এ সমাবেশে তিনি কৃষকের খাজনা মওকুফের ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু তথ্যসহ দুই অংশের বৈষম্য তুলে ধরে জনগণকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। দেশের মানুষের সুখ-দুঃখ তিনি নিজের অন্তরে ধারণ করতে পেরেছিলেন। নিজের ৬-দফার পর ১১-দফা ঘোষণা করা হলে তিনি সেটাকেও নিজের দাবী হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

১৯৭০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে পলোগ্রাউন্ডে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। যে সময়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হতো যে, বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিলে ইসলাম যাবে, দেশ হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত হবে, সে সময়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব জাহানের চলমান যুদ্ধে আরব জাহানকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। এটা ছিল তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারীদের গালে একরকম চপেটাঘাত। জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, যে বাংলার মানুষের বুকের তাজা খুনের বিনিময়ে তিনি মৃত্যুর দ্বার হতে ফিরে এসেছেন, সেসব বীর বন্ধুদের পবিত্র শোণিতের সাথে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবেন না। তাই ৬ দফা ও ১১ দফার পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে চলবে।

জনসভায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চাওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, দেশের দুই অংশের মধ্যের পর্বতপ্রমাণ বৈষম্যের চির অবসানের জন্যই তিনি এ দাবি তুলেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিগত ২২ বৎসরে পূর্ব পাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে ২২ শ’ কোটি টাকা। আর ব্যয় করেছে ১৭ শ’ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তান আয় করেছে ১৭শ’ কোটি টাকা। আর ব্যয় করেছে ২৬ শ’ কোটি টাকা।

বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, বৈদেশিক ঋণ মূলতঃ পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যয় করা হলেও পূর্ব পাকিস্তানের ঘাড়ে ২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণের বোঝা চাপানো হয়েছে। বিগত ২২ বৎসরে পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ৩ শ’ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ ব্যয় করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, পশ্চিম পাকিস্তানে ২৮ শ’ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলার মানুষেরা দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ হওয়া সত্বেও সরকারী চাকুরী ও সামরিক বাহিনীতে সমানাধিকার পায় নাই। বঙ্গবন্ধু জানতেন স্বায়ত্বশাসনের পথ ধরেই এদেশের মানুষকে মুক্ত করতে হবে, নিজেদের আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর যদি পাকিস্তানের সরকার বাঙালীদের ন্যয্য অধিকার মেনে না নেয়, তাহলে এ পথেই আসবে বাঙালীর স্বাধীনতা।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত ১১টায় হানাদার পাক সেনাবাহিনী কামান, বিমান, ট্যাংক নিয়ে বাঙালী জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সমগ্র বাঙালী জাতিকে ধ্বংস করার উম্মত্ততায় তারা মেতে উঠে। ঠিক তার কিছু পরেই রাত সাড়ে এগারোটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে নির্দেশ পাঠালেন স্বাধীনতা যুদ্ধের। আদেশ দিলেন, শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে হবে। কোন আপোস নয়। হানাদারদের তাড়িয়ে দিতে হবে।

জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে প্রেরিত বার্তায় তিনি পুলিশ, আনসার, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ানদের প্রতি হাতিয়ার তুলে নেয়ার নির্দেশ দিলেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর নির্দেশ বার্তায় বলেন,‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানায় ইপিআর বাহিনীর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে, নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। বিশ্ববাসীর কাছে আমার আকূল আহ্বান, আমাদের সাহায্য করুন। মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে লড়াই করছে। আমি আপনাকে আহ্বান করছি, আদেশ দিচ্ছি, আল্লাহর নামে যুদ্ধ করুন, শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও দেশকে মুক্ত করুন। পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসার বাহিনীকে হাতিয়ার তুলে নিয়ে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলুন। কোন আপোস নয়। জয় আমাদের হবেই। মাতৃভূমির পবিত্র মাটি থেকে শেষ শত্রুটিকে তাড়িয়ে দিন। সমস্ত আওয়ামী লীগার, কর্মী এবং সকল দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের ঘরে ঘরে আমার এ নির্দেশ পৌঁছিয়ে দিন। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন।’

জহুর আহমদ চৌধুরীর উপর কি পরিমাণ অকৃত্রিম বিশ^াস আর নির্ভরতা ছিল, আস্থা ছিল বঙ্গবন্ধুর, এতে সহজেই অনুমান করা যায়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার এ নির্দেশ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছে। জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রচারপত্রও বিলি করা হয়েছে। এ নির্দেশ প্রচারের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলন শুরু হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম থেকেই শুরু হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৯ মার্চ বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রাম সফর করেন। চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত ওই বিশাল জনসভায় ভাষণদানকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশ হবে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের দেশ। ধনীদের এখানে আরো ধনী হতে দেওয়া হবে না। ব্যাংক, বীমা, পাটকল, চিনিকল ও বস্ত্রমিল জাতীয়করণের উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি জানি শিল্পপতিরা এতে খুশী নন। কিন্তু এখন থেকেই শিল্পপতিদের জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। সব প্রতিষ্ঠান আমি আমার নিজের জন্যে জাতীয়করণ করিনি, জনগণের জন্যেই করেছি। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষই এখন এসব সম্পত্তির মালিক। এ থেকেই বঙ্গবন্ধুর ভবিষ্যত অর্থনীতির রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, অশুভ কর্মতৎপরতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আমি জনগণের শক্তি নিয়েই মোকাবিলা করবো। এসব ব্যক্তি যে কোন দল আর যে কোন সংস্থারই হোক না কেন। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে তিনি বলেন, মুনাফাখোররা যদি অবিলম্বে তাদের মনোভাব পরিবর্তন না করে তাহলে তাদের নির্মুল করে দিতে আমি পুলিশের নয়, জনগণের সাহায্য চাইবো। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও প্রশাসনকে ব্যবহার না করে জনগণকেই তাঁর শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙ্গালীদের উল্লেখ করে এ সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, জনাব ভুট্টোকে এদের বাংলাদেশে ফিরে আসতে দিতেই হবে। পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙ্গালীরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তারা সেখানে কোন সমস্যা সৃষ্টি করেনি। তাদের বিচার করার কোন অধিকার ভুট্টোর নেই।

ওই সময়ে দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষই আমার ক্ষমতার উৎস। সেনাবাহিনী বা পুলিশ আমার ক্ষমতার উৎস নয়। আর জনগণের ক্ষমতায় বলীয়ান হয়েই আমি কাজ করতে চাই। বঙ্গবন্ধু আরো বলেন, জেনে শুনে যারা পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করেছে, আমার সরকার অবশ্যই তাদের বিচার করবে এবং শাস্তি দেবে। তবে অবস্থার চাপে পড়ে যারা হানাদার বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করেছে তাদের অবস্থাটিও অবশ্যই বিবেচনা করা হবে।

১৯৭২ সালের ৪ জুলাই তিনি আবারও কুমিল্লা জেলা সফর করেন। কুমিল্লার অভয় আশ্রম ময়দানের জনসভায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাটিতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। তিনি আরও বলেন, আমি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের মাটিতেই আমি তাদের বিচার করবো। অপরাধীদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্দীদের বিচারের ব্যাপারে সংযত হওয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জনাব ভুট্টোর অনুরোধে তিনি কর্ণপাত করবেন না।

তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জনাব জেড এ ভুট্টো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন বা না দেন, তাতে আমাদের কিছু এসে যায় না। বিশ্বসভায় কি করে নিজের আসন করে নিতে হয় সাড়ে সাত কোটি লোকের দেশ বাংলাদেশ তা ভাল করেই জানে। ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক শত চাপ থাকা সত্বেও একমাত্র বঙ্গবন্ধু বলেই এমন সাহসী বাক্য উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন।

নির্বাচন উপলক্ষে গণসংযোগ সফরের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩ তারিখে কক্সবাজার, পটিয়া ও চট্টগ্রামের পোলো গ্রাউন্ডে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিশাল জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করেন। বাংলার মাটি হতে আঞ্চলিকতার মূলোৎপাটনের আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন যে, বীর চট্টলার সাহসী জনতা আঞ্চলিকতা পরিহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই বলিষ্ঠ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনেও বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামকেই বেছে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে।

জনসভায় জাতীয় মূলনীতির ব্যাখ্যা করে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, ধর্মনিরপেক্ষতার অপব্যাখ্যার কোন অবকাশ নাই। তিনি দুপ্তকন্ঠে ঘোষণা করেন যে, ধর্মনিরপেক্ষতার মানে ধর্মহীনতা নয়। তবে অতীতের ন্যায় ধর্মকে নিয়ে আর রাজনীতির খেলা খেলতে দেওয়া হবে না। বাংলার মাটিতে স¦াধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে, একথা ঘোষণা করে তিনি বলেন যে, ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ হতে চলতি বৎসর সর্বাধিক সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে হজ্জ করতে পাঠানো হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সমাবেশে বাংলাদেশের বাস্তবতা স¦ীকার করে নেওয়ার জন্য চীনের নেতৃবৃন্দের প্রতিও আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন যে, চীনের জনসাধারণের সাথে বাংলাদেশের জনসাধারণের কোন শত্রুতা নেই। চীন কর্তৃক জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্তির বিরুদ্ধে ভোট দানের প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু চীনকে তার নিজের অতীতের কথা স¥রণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, সুদীর্ঘ ২৪ বৎসর চীনও জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি। কিন্তু এতে চীনের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব কেউ আটকে রাখতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধু ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩ তারিখে রাঙ্গামাটি, ফেনী ও লক্ষীপুরে ৩টি পৃথক পৃথক জনসমাবেশে ভাষণদান করেন। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, বাংলার মাটিতে সকলের সমান অধিকার ও সুযোগ সুবিধা থাকবে। কারণ সকলেই এ দেশ মাতৃকার সন্তান। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণার মধ্য দিয়েই পাহাড়ের মানুষেরা স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলে।

তিনি লক্ষীপুরের জনসভায় বলেন যে, দেশের গণতন্ত্র সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তিনি সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ততম সময় সংবিধান ও নির্বাচন দিয়েছেন। জাতির পিতা বলেন যে, ভোট চাওয়ার জন্য এখন একটি দল মাঠে নেমেছে। কিন্তু তাঁরা যদি ভোট না পায় এবং জনগণ যদি আমাকে ভোট দেন তবে তা আমার দোষ হবে না। একই তারিখে ফেনীর জনসভায় তিনি বলেন, দেশকে গড়ে তোলা ও ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে অঙ্কিত স¦াধীনতাকে সংহত করার জন্য সকলকেই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু রাঙ্গামাটিতে ঘোষণা করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের লোকদের আর উপজাতীয় হিসাবে গণ্য করা হবে না। তাঁরা দেশের অন্যান্য এলাকার লোকদের সাথে সমান ও পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করবেন।

কোর্ট বিল্ডিং ময়দানে বক্তৃতাকালে বঙ্গবন্ধু আশ^াস দেন যে, পার্বত্য এলাকার লোকদের নিজস¦ ভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী বসবাসের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তাঁদের জীবনযাত্রার কোন প্রকার হস্তক্ষেপ বা তাঁদেরকে শোষনের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেওয়া হবে।

গণসংযোগ সফরের ৬ষ্ঠ দিনে ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩ তারিখে তিনি কুমিল্লার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরের জনসভায় দেশবাসীর কর্তব্য নির্দেশ করতে গিয়ে বলেন, স¦াধীনতার জন্য জাতির সুদীর্ঘ সংগ্রাম সফল হয়েছে। ভারত বিরোধী প্রচারণার উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, ভারতের সমালোচনা করা কিছু সংখ্যক লোকের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বিপদের দিনে ভারতই আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল ণ্ড খাদ্য দিয়েছিল। এক কোটি লোক সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। অথচ এরাই এখন বন্ধু ও প্রতিবেশী ভারতের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। আসলে তারা মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি। শুধু দুর্দিনে ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে ছিল। ভারত এক কোটি লোককে আশ্রয় না দিলে বিপুলসংখ্যক লোক অনাহারে মৃত্যুমুখে পতিত হতো বলে বঙ্গবন্ধু মন্তব্য করেন।

তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশ ও ভারত দুটি স¦াধীন ও সার্বভৌম দেশ। রক্তের বুনিয়াদের উপর দু’দেশের মৈত্রী গড়ে উঠেছে উল্লেখ করে যে, এই দুটি বন্ধু দেশ কখনও একে অপরের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। জনসভায় তিনি চাঁদপুরকে মেঘনার কবল থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জাতির জনক ঘোষণা করেন যে, ভবিষ্যতে কি হবে আমি জানি না। তবে আমি দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির শুভ সূচনা নিশ্চিত করতে চাই। জাতির জনক বলেন, তিনি কখনও মিথ্যা ওয়াদা করেন না কিংবা ভিত্তিহীন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভ্যাসও তাঁর নেই। তিনি আবেগ জড়িত কন্ঠে বলেন, দুঃখী মানুষের দুর্দশা আমি সহ্য করতে পারি না। তিনি গরীবের দুঃখ মোচনে সম্ভাব্য সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন।

বঙ্গবন্ধু বলেন যে, পাকিস্তানী জিন্দানখানা হতে প্রত্যাবর্তনের পর জনগণকে অনাহারের হাত হতে রক্ষার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য হয়েছি। জনগণ যদি দু’বেলা দু’মুঠো ভাত, পরিধানের জন্য কাপড় পায়, তাহলেই আমি শান্তি পাব।

জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, এ দেশের বুক হতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ উৎপাটন করতে হবে। যারা দেশের সাম্প্রদায়িকতার মনোভাব জ¦ালিয়ে তোলার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, কোন ধর্মীয় ব্যাপারে কাউকে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না। সকলেই স¦াধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারবেন। বঙ্গবন্ধু জনগণকে স¥রণ করিয়ে দিয়ে বলেন যে, বিগত ২৩ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রায় ৬ হাজার বাঙ্গালীকে হজব্রত পালনের জন্য মক্কা গমনের অনুমতি দেওয়া হয়।

৪ মার্চ, ১৯৭৪ তারিখে দাউদকান্দি থানা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, বাঙালীরা কখনও মাথা নত করে না, আমিও করি না। এ জনসভায় পাকিস্তানীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা সুখে থাক। তোমরা বলো, বাংলার মানুষের সাথে অন্যায় করেছো, হত্যা করেছো। তোমরা মাফ চাওÑবাংলার মানুষ মাফ করতে জানে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানসহ নেপাল এবং শ্রীলংকার সাথে সুখে বাস করতে চায়Ñআত্মমর্যাদা নিয়ে এবং স্বাধীন সার্বভৌত্বের মাধ্যমে।

দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের কাপড় নেই, ঔষধ নেই, কিছুই নেই। এমন কোন জিনিস নেই, যা বিদেশ হতে আনতে হয় না। কিন্তু টাকা কোথায় পাব? তবু ২০০ কোটি টাকার রিলিফ আনা হয়েছে, ১৮টা জাহাজ কেনা হয়েছে, ৮টা বিমান কেনা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ভিক্ষা করে দেশ চালানো যায় না। ভিক্ষুকের জাতের কোন ইজ্জত থাকে না। আমি তাঁদের ভিক্ষুক করে রাখতে চাই না। আমি চাই তাঁরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

রাতের অন্ধকারে যারা ডাকাতি করে তাদের প্রতি তিনি কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার হুকুম রইল এদের ধরতে পারলে এমন মার দিবে যাতে মনে থাকে। তবে জানে মেরো না, থানায় নিয়ে যেও।

বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলার মানুষকে আবার ডাক দিতে চাই-এবারের সংগ্রাম চোরের বিরুদ্ধে, ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১১ই মার্চ, ১৯৭৪ তারিখে কুমিল্লা সেনানিবাসে বাংলাদেশের প্রথম সামরিক একাডেমি উদ্বোধন করেন।উদ্বোধনকালে উপমহাদেশের সম্প্রীতির নব অধ্যায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি উপমহাদেশে শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্যে বাস করতে চাই। কারও সঙ্গে শত্রুতায় নয় বরং সকলের সাথে শান্তিতেই আমি বাস করতে চাই। তিনি বলেন, আমি কারও ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চাই না, তেমনি কোন মহলের হস্তক্ষেপও আমি সহ্য করব না। বঙ্গবন্ধু পরিদর্শকদের খাতায় স্বাক্ষর করেন এবং তাতে লিখে রাখেন ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না’। তিনি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগারও পরিদর্শন করেন এবং পরির্দশকদের খাতায় লিখে রাখেন ‘স্বাধীনতার জন্যে যারা আত্মদান করেছেন তাদের কেউ কখনও ভুলবে না।’

বঙ্গবন্ধু ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭৪ তারিখে চট্টগ্রামস্থ নৌ ঘাঁটিতে নৌবাহিনীকে নিশান প্রদান করতে আসেন। তিনি চট্টগ্রাম নৌঘঁাঁটির নামকরণ করেন বিএনএস ঈসা খান এবং মুক্তিযুদ্ধকালের শহীদদের স্মরণে প্রথম প্রশিক্ষণ জাহাজটির নামকরণ করেন বিএনএস শহীদ রুহুল আমিন। বঙ্গবন্ধু বলেন, আমাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি কারো উপর হামলার জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্যই। আমরা অপরের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে ইচ্ছুক নই। অনুরূপভাবে আমরা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অপর কারো হস্তক্ষেপ বরদাশত করব না।

নৌবাহিনীর জোয়ানদের প্রতি শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, নিরপরাধীদের উপর আঘাত হেনো না। কারণ অত্যাচারী কোন দিন টিকে থাকতে পারে না। তিনি জনগণের ভালবাসা অর্জন এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে ব্রতী হওয়ার জন্য নৌবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে উন্নয়নের সম্ভুকগতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, আমি বাংলাদেশকে বিক্রি করতে বা বন্ধক দিতে চাই না। আত্মসম্মান বজায় রাখতে চাই। আস্তে আস্তে দেশ গড়ব। কিন্তু মাথা নত করব না। তিনি বলেন যে, যতদিন আমি বেঁচে আছি ততদিন কোন ক্রমেই বাংলাদেশকে বিদেশীদের কাছে বন্ধক দিব না।

১৯৭৫ সালের ১০ই জানুয়ারি ঢাকা হইতে কুমিল্লা যাওয়ার পথে দাউদকান্দিতে এক অনির্ধারিত গণসমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, দুর্নীতিবাজ ও সমাজবিরোধীদের উদ্দেশ্যে আমি অনেক আবেদন করেছি, অনুরোধ করেছি কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি। তাই এবার আমি চূড়ান্ত আঘাত হানতে চাই।

গণসমাবেশে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, আপনারা কষ্টে আছেন জানি, বন্যায় আপনাদের ক্ষতি হয়েছে তাও জানি। আপনাদের দুঃখ কষ্ট আমার চেয়ে আর কেউ ভাল জানেন না। বাংলার মাটি হতে দুস্কৃতিকারী, চোরাকারবারী, দুর্নীতিবাজ ও সমাজবিরোধীদের চিরতরে উৎখাত করার আহবান জানাচ্ছি। আপনারা আমার সাথে সহযোগিতা করুন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ধ্বংসস্তুপের মধ্য হতে দেশকে গড়া সহজ নয়। এ জন্য একাগ্রতা নিয়ে সকলকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

শহীদ লেঃ কঃ এম আর চৌধুরী স্টেডিয়ামে ১১ জানুয়ারি, ১৯৭৫ তারিখে কুমিল্লা সামরিক একাডেমীর প্রথম ব্যাচের শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দানকালে বঙ্গবন্ধু বলেন আমাদের সেনাবাহিনী পাকিস্তানের মত পেশাদারবাহিনী হবে না, এটা হবে জনগণের বাহিনী। শৃঙ্খলা ছাড়া কোন জাতি বড় হতে পারে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মালিক আজ জনসাধারণ, তাই বাংলার মাটিতে মিলিটারী একাডেমী স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ইনশাল্লাহ এমন একদিন আসবে যেদিন শুধু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া নয় সারা বিশ্বের লোক এই একাডেমী দেখতে আসবে। তিনি বলেন, তোমাদের এক পর্যায়ের শেষ হয়েছে এখন আরেক পর্যায়ের শুরু। সে পর্যায়ের দায়িত্ব অনেক বেশী। তোমাদের দায়িত্বজ্ঞান থাকা দরকার। ওটা না হলে মানুষ হওয়া যায় না। তিনি বলেন, আমি আজ গর্বিত, আমার সৈনিকরা বিশে^র যে কোন দেশের সৈনিকদের মোকাবিলা করতে পারে। বঙ্গবন্ধু বলেন, বাঙালীরা যুদ্ধ করতে পারে না, তারা কাপুরুষ, এটা যে সত্য নয়, তার প্রমান দিয়েছে মুক্তিবাহিনী। আমরা আর কিছু হতে পারি কিন্তু কাপুরুষ নই। একটা জিনিস মনে রাখা দরকার সোনার মানুষ যখন আছে তখন ইনশাআল্লাহ সোনার বাংলাও গড়ে উঠবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এরপর ১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫ তারিখে রাঙ্গামাটিতে সফরকালে ঘোষণা করেন যে, জাতীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার অবশ্যই রক্ষা করা হবে এবং তাঁদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। বঙ্গবন্ধু আরও ঘোষণা করেন যে, উপজাতীয় অধিবাসীরা অন্যদের মতই দেশের সমান নাগরিক। স্থানীয় সমস্যাবলী সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট বলেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কর্মসূচী রচনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে ৩টি জেলায় ভাগ করা হয়েছে।

১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের দীর্ঘ পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু অসংখ্যবার চট্টগ্রামে এসেছেন। তাঁর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক অনেক বড় বড় ঘোষণা চট্টগ্রামের মাটিতেই দিয়েছেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েছেন। কী নেই সেখানে! সামাজিক সহাবস্থান, অসাম্প্রদায়িকতা, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ইত্যাদি সকল বিষয়েই তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের মানুষের সামনে তুলে ধরে মতামত জানতে চেয়েছেন, জনমত গঠন করেছেন। এদেশের মেহনতি কৃষক-শ্রমিকের শোষণ-বঞ্চনার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি কী হবে তাও তিনি চট্টগ্রামেই ঘোষণা করেছেন।

বাংলাদেশের সূচনালগ্নের আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন নিয়েও তিনি এখানে কথা বলেছেন। বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে তিনি সুনির্দিষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেন চট্টগ্রামের মাটিতে। পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্যের ইতিহাস তুলে ধরে স্বায়ত্বশাসনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগে। এভাবেই বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষকে মহিমান্বিত করেছেন। চট্টগ্রামের মানুষও বঙ্গবন্ধুকে বুক চিতিয়ে ভালবাসা দিয়েছেন, প্রত্যেকটি কথা, প্রত্যেকটি নির্দেশনা বাণীর মত অন্তরে ধারণ করেছেন। কিংবা বলা যেতে পারে এভাবেই চট্টগ্রাম হয়েছে বঙ্গবন্ধুর একান্ত আপনার।


লেখক :
মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান
উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা
আঞ্চলিক তথ্য অফিস, চট্টগ্রাম
[email protected]

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন