প্রথম সেমিফাইনালই যেন ফাইনাল

স্পোর্টস ডেস্কঃবিশ্বকাপের ড্র হওয়ার পর চোখ যথারীতি মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে; ১৫ জুলাইয়ের ফাইনালে। কিন্তু প্রথম রাউন্ডে আর্জেন্টিনা নিজেদের গ্রুপে রানার্স-আপ হওয়ায় লাল কালিতে দাগ দেওয়া ছিল আজকের তারিখ, ১০ জুলাই।

আজকের সেমিফাইনালে ভেন্যু সেন্ট পিটার্সবার্গ। এখানেই যে সেমিফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার কথা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার।

হায়, সেখানে কিনা খেলবে আজ তাদের বিদায় করা দুই দল ফ্রান্স-বেলজিয়াম! আর্জেন্টিনাকে শেষ ষোলোতে হারানোর পর কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়েকে হারিয়ে সেমির টিকিট পেয়েছে দিদিয়ের দেশমের দল। আর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে জাপানকে ৩-২ গোলে হারানোর পর শেষ আটে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে আজকের সেমিফাইনালের অন্য দল বেলজিয়াম।

ধ্রুপদী লড়াই হয়তো নয়, কিন্তু নিজেদের ফুটবলীয় সামর্থ্য দিয়েই যে দল দুটি এ পর্যায়ে এসেছে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই কারো। আজকের সেমিতে বিজয়ী দলের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনাও যে প্রবল, তা নিয়েও একমত হবে প্রায় সবাই। ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়ার চেয়ে ফ্রান্স-বেলজিয়াম তো ধারে-ভারে ঢের এগিয়ে।

মারিও জাগালো, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার…দিদিয়ের দেশম। নাহ, এখনো হয়নি বটে।

তবে এবার যদি ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারেন, তাহলে তো এই ফরাসি ব্রাকেটবন্দি হবেন ওই দুই কিংবদন্তির সঙ্গে। খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য রেকর্ড হয়ে যাবে তাঁর। একদিক দিয়ে শুধু বেকেনবাওয়ারের সঙ্গেও। কেননা ফ্রান্সকে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জেতানোর সময় যে অধিনায়ক ছিলেন দেশম। পশ্চিম জার্মানির ‘কাইজার’-এর মতোই।

সেন্ট পিটার্সবার্গের সংবাদ সম্মেলনে কাল প্রশ্নটি শুনলেন দেশম। এরপর হেসে উড়িয়ে দিলেন তত্ক্ষণাত্, ‘আশা করছি সেমিফাইনাল শেষে এ সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নটি আমাকে আবার করতে পারবেন। আপাতত আমি নিজের কথা কিছুই ভাবছি না। বেলজিয়ামের বিপক্ষে দলকে জিতিয়ে কিভাবে ফাইনালে নেওয়া যায়, তা নিয়েই ভাবনা। ’

ছয় বছর আগে ফ্রান্স দলের দায়িত্ব নেন যখন দেশম, রবের্তো মার্তিনেস তখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের নিচু সারির দল উইগান অ্যাথলেটিকসের

কোচ। সেই তাঁর হাতে এখন বেলজিয়ামের ‘সোনালি প্রজন্মের’ স্বপ্নপূরণের ভার। ভীষণ রোমাঞ্চিত তিনি। আর দলকেও দিচ্ছেন না কোনো চাপ। সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছে সে ঘোষণা দিয়েছেন বেলজিয়ামের কোচ, ‘ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আমাদের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে কেউ ভাবেনি। এখন ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের আগেও নিশ্চয়ই ভাবছে না। আমরা চাই নিজেদের কাজটি করতে। বেলজিয়ামের এই দলটির অবশ্যই সম্ভাবনা রয়েছে ফাইনাল খেলার। সেখান থেকে আমরা খুব দূরেও নেই। ’

বেলজিয়ামের চেয়ে আর কোনো দলের বিপক্ষে বেশি ম্যাচ খেলেনি ফ্রান্স। পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে ৭৪ বার। এখানে জয়ের পাল্লা হেলে বেলজিয়ামের দিকে। ৩০ জয় তাদের; ফ্রান্সের ২৪ আর বাকি ১৯ ম্যাচ ড্র। অথচ বিশ্বকাপে এ দুটি দলের দ্বৈরথ মোটে দুইবার। ইউরোতে একবার। প্রতিবারই জয় ফ্রান্সের। ১৯৩৮ বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে ৩-১ এবং ১৯৮৬ আসরের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলায় অতিরিক্ত সময়ে ৪-২ গোলে তারা হারায় বেলজিয়ামকে। আর ১৯৮৪ ইউরোর গ্রুপ পর্বে মিশেল প্লাতিনির হ্যাটট্রিকে ফরাসিরা জেতে ৫-০ গোলে। দুই দলের সর্বশেষ দিন মুখোমুখিতে অবশ্য জিততে পারেনি ফ্রান্স। দুই ড্রয়ের সঙ্গে এক জয় বেলজিয়ামের। ২০১৫ সালের জুনের সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচে ফ্রান্সকে ৪-৩ গোলে হারায় ‘রেড ডেভিল’রা।

এটি ফ্রান্সের ষষ্ঠ সেমিফাইনাল। প্রথম তিনবারই মুখ থুবড়ে পড়ে ওখানে; কিন্তু ১৯৯৮ ও ২০০৬ সালে এই বাধা টপকে পৌঁছে যায় ফাইনালে। অন্যদিকে বেলজিয়াম বিশ্বকাপ সেমিতে খেলেছে একবারই—১৯৮৬ সালে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার জোড়া গোলে ফাইনাল খেলার স্বপ্নপূরণ হয়নি তাঁদের। এবার পেছনে যখন সর্বশেষ ২৪ ম্যাচে না হারার রেকর্ড এবং সর্বশেষ ম্যাচেই ব্রাজিলকে হারানোর প্রেরণা—শিরোপা জয়ের স্বপ্নও দেখছে বেলজিয়াম। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো।

অঘটনের এই বিশ্বকাপে পরাশক্তিরা ঝরে গেছে একে একে। টিকে থাকা দলগুলোর মধ্যে মাঠের খেলার হিসাবে সবচেয়ে শক্তিশালী এ দুটি দলই। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, আতোয়ান গ্রিয়েজমান, পল পগবাদের পারফরম্যান্সে দেখা যাচ্ছে বিশ্বজয়ের রং। নিষেধাজ্ঞার কারণে উরুগুয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল মিস করা ব্লেইস মাতুইদিও ফিরছেন আজ। অন্যদিকে বেলজিয়ামের খেলোয়াড়দের সামর্থ্যও কম কিসে! এডেন হ্যাজার্ড, কেভিন দ্রে ব্রুইনে, রোমেলু লুকাকুরা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এরই মধ্যে। ব্রাজিলের বিপক্ষে কোচ মার্তিনেসের ভিন্ন কৌশল চমকে দিয়েছে সবাইকে। লুকাকু-হ্যাজার্ডকে উইংয়ের দিকে খেলিয়ে দে ব্রুইনেকে সামনে তুলে প্রায় ‘ফলস নাইন’ হিসেবে খেলিয়েছেন। আজ কোন চমক নিয়ে হাজির হন বেলজিয়ামের কোচ, কে জানে!

ফুটবলপ্রেমীদের হাহাকার থাকবে তবু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল হলো না বলে! ফ্রান্স-বেলজিয়ামের তাতে থোড়াই কেয়ার! তারা কি আর জানে না, ইতিহাসে অনেক সময় বেদনায় রক্তও হয়ে যায় আনন্দের ফুল; শোক হয়ে যায় উত্সব। যদি এবারের বিশ্বকাপ জিততে পারে তারা, তাহলে সেটিই তো হবে।

শিরোপার চূড়ান্ত মহারণে নামার আগে আজ পরস্পরের বাধাটি শুধু টপকাতে হবে ফ্রান্স-বেলজিয়ামের!