ধর্ষণ কি উৎসবে পরিণত হচ্ছে?

আমরা দেখতাম একটি মুরগীর পেছনে একটি মোরগ ঘুরঘুর করছে, ঘুরঘুর করতে করতে এক পর্যায়ে মুরগীর উপর চেপে বসেছে। দেখা যায় সে মুরগীটির সাথে জোর করে যৌনকার্য সম্পাদন করে ফেলছে। অন্যান্য অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রেই এরকম দেখা যায়। একটি প্রাণী যখন আরেকটির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে বা পালাতে চাচ্ছে, তখন এদের সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হচ্ছে। অর্থাৎ জোর করে যৌন সম্পর্ক করাটা পশু বা অন্য প্রাণীর মধ্যে হতেই পারে। সভ্যতার চূড়ায় বসে মানুষ কেন এটা করবে? তখনই করবে, যখন সে প্রতিপক্ষের চেয়ে শক্তিশালী হবে এবং সমাজপতিরা ছাড় দেবে তাদেরকে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রোমের প্রতিষ্ঠাতা রমিউলাস ও তার সঙ্গীদের যখন ঘর-সংসার করার ইচ্ছে জেগেছিলো, তখন তারা পাশের গোত্র সেবাইনদের কাছে প্রস্তাব পাঠালো তাদের মেয়েদের বিয়ে করার। সেবাইনরা এতে রাজি না হওয়ায় রমিউলাস এক অভিনব বুদ্ধি বের করলো। একদিন ঘটা করে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেবাইনদের মেয়ে-ছেলে সবাইকে দাওয়াত করে তারা। সেবাইনরা তাতে যোগদান করলে, ধূর্ত রমিউলাসের ইঙ্গিতে মওকা বুঝে তার সঙ্গীরা অতিথী মেয়েদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। খুন করে ছেলেদের। এই যে কৌশল করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন এসবও ধর্ষণ। সেই আদিম যুগ থেকে সভ্যতার বিপরীতে অবস্থান নেয়া মন্দ মানুষেরা এসব করে আসছে। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে? ধর্ষণ কেবলমাত্র যৌন-নিপীড়ন নয় বরং এর সাথে জড়িয়ে থাকে সামাজিক লাঞ্ছনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। ফলে ধর্ষিতা শারীরিকভাবে যে ক্ষতির সম্মুখীন হয় তার চেয়ে বেশি সমাজজীবন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে ও এক গ্লানিময় জীবন গ্রহণে বাধ্য হয়। এতে তার সারাজীবনের সত্যটাই বিপর্যস্ত হয়।

প্রভাবশালী পরিবারের মেয়েদের ধর্ষিত হবার সংবাদ খুবই কম। গভীর রাতে নাইট ক্লাব থেকে একা ফেরার পথে কেন কেউ শরীরের লোভে বড়লোকের মেয়েদের পথরোধ করার সাহস পায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মহিলা সদস্যটি একা থাকলেও কেউ শরীরের দিকে তাকাবার কথা ভাবতেও পারে না। অথচ লোকাল বাসে পুরুষ যাত্রীটিকে সীটে বসা মহিলার দিকে ঝুঁকে দাঁড়াতে দেখা যায়। ভিড়ের মধ্যে নারীর শরীর ঘেঁষে হাটে সক্ষম পুরুষ। এর কারণ স্পষ্ট। চিরকাল মেয়েদের আমরা দেখে আসছি দুর্বল হিসেবে। দুর্বল পরিবার কিংবা দুর্বল সামাজিক অবস্থানে থাকা পরিবারের মেয়েরা নিজেদের নির্ভার চলাফেরার সহায়তাটা এখনও শতভাগ পায়নি বলেই এত ঘটনা ঘটছে।

সমাজ-মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছিলেন, আদিম-অবাধ যৌনাচার প্রথার ওপর সমাজ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পেরেছিল বলেই মানুষের সমাজ আদিম খোলস ছেড়ে, বন্য-বর্বর জীবন ছেড়ে সভ্যতার জন্ম দিতে পেরেছিল। ফ্রয়েডিয়ান তত্ত্ব মতে, পুরুষ তার আশে-পাশে কোনও নারীর উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই তার সমস্ত নগ্ন শরীর সে কল্পনা করে ফেলে মুহূর্তেই, নারীও পুরুষকে দেখলে এ রকম চিন্তা করে। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রমাণ করে যৌনচিন্তার ধরন, চিন্তা-প্রসূত তাড়না এবং তাড়না-উদ্ভূত কর্ম-প্রক্রিয়া নারী-পুরুষের মধ্যে ভিন্নভাবে বিরাজমান এবং ক্রিয়াশীল। আর এই ভিন্নতা জনিত কারণেই প্রায় সব পুরুষ একজন সম্ভাব্য ধর্ষক, নারী নয়। নারী-পুরুষের মধ্যে যৌন-তাড়না থাকবে এটাই স্বাভাবিক (সম-লিঙ্গের মধ্যে যৌন-তাড়নার ধরন এ লেখার বিষয়-বস্তু নয়)। কিন্তু এই তাড়না মাত্রা ছাড়ালেই সেখানে ধরা পড়ে কদর্য। তাই পুরুষ যখন নারীর কাছে পরিচিত বা স্বল্প পরিচিত তখন অনেক ক্ষেত্রেই সে ছলে-বলে, কলে-কৌশলে, লোভ-দেখিয়ে নারীকে ‘যৌন-কর্মে-সম্মতি’ আদায়ে বাধ্য করে, অথবা জোর-পূর্বক ‘যৌন-কর্মে-সম্মতি’ আদায় করে। মূল কথা জোর করে সম্মতি আদায় করে যৌন-কর্ম এক ধরনের ধর্ষণ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে জোর-পূর্বক যৌন কর্ম হলে সেটা পৃথিবীর বহু দেশে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। আমাদের দেশে স্বামী-স্ত্রীর বাইরে অন্য কোথাও জোরপূর্বক ধর্ষণ হলেও তো সেটা ধামাচাপা দেয়া হয়।

কিছুদিন ধরে ধর্ষণ আমাদের দেশে রীতিমত মহোৎসবে রূপ নিয়েছে। যার যাকে ইচ্ছে সে তাকেই ধর্ষণ করছে। নয় মাসের শিশু থেকে আশিঁ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত বাদ পড়ছে না কেউই। এই ধর্ষণের সাথে যোগ হয়েছে হত্যা। পাশবিকতার চূড়ান্তে ধর্ষকেরা। ধর্ষণ করেই হত্যা করে ফেলছে। গত এক মাসের যে চিত্র, সেটা আদিম যুগের বর্বরতাকেও হাঁর মানিয়েছে। হাঁর মানিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রের বিভীষিকাকেও। চারশ শিশুই নির্যাতিতা হবার ঘটনা ঘটেছে এক মাসে।

কেন এই ধর্ষণ? বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই দোষারোপ করছেন প্রায় সকলেই। সমাজে ধর্ষণের মাত্রা বৃদ্ধির কারণ হিসাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করেছেন গবেষক ও বিশ্লেষকেরাও। তারা মনে করেন, ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি শিশুদের বিকাশের সময়ে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে। একজন সুস্থ মানুষ কখনো ধর্ষক হবে না। তাই এই ভোগবাদী সমাজে বেড়ে উঠতে গিয়ে শিশুদের কাছ থেকে স্মার্ট ফোন দূরে রাখতে হবে। স্মার্ট ফোনের নাগাল পেলেই তাদের জন্য পর্নো সাইটগুলোতে বিচরণের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। শিশু বয়সে এ ধরনের উত্তেজক সাইট দেখলে তাদের মাঝ থেকে নারীর প্রতি মমতা, ভালোবাসা দূর হয়ে তাদের কামের বস্তু হিসেবে মনে করতে শুরু করবে। তাই শিশুদের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশ সবচেয়ে জরুরি।

লেখকঃ
মামুন নিলয়
উন্নয়ন কর্মী ও শিক্ষার্থী
কক্সবাজার সরকারি কলেজ।

 

 

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব উখিয়া নিউজ- এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য উখিয়া নিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন