জাতিসংঘের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির গোপন নথি ফাঁসকারীদের খুঁজছে মিয়ানমার

ডেস্ক রিপোর্ট::
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে জাতিসংঘের দুই সংস্থার সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির গোপন খসড়াটি কে বা কারা ফেসবুকে ফাঁস করেছে তা জানার চেষ্টা করছে মিয়ানমার সরকার। এ নথি কি জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট কেউ ফাঁস করেছে কিংবা কূটনীতিকদের কেউ এ কাজ করেছেন নাকি সাংবাদিকরা তা ফাঁস করেছেন; তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র উ জ হতেকে উদ্ধৃত করে দেশটির সংবাদমাধ্যম ইরাবতি খবরটি জানিয়েছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার একপর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে সেই চুক্তির আওতায় এখনও একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। এরমধ্যেই গত ৬ জুন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে জাতিসংঘ। তবে সেখানেও নাগরিকত্ব প্রশ্নটি উপেক্ষিত।

জাতিসংঘ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ না করা হলেও গত ২৯ জুন তা অনলাইনে ফাঁস হয়। ‘ইয়াঙ্গুন ইনফরমার’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ৮ জুন স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতা চুক্তির কয়েকটি নথি ফাঁস করা হয়। দাবি করা হয়, এগুলোতে চুক্তির বিস্তারিত আছে। পরদিন (৩০ জুন) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই নথি পর্যালোচনা করে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, খসড়া চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি মেলেনি। উপেক্ষিত হয়েছে তাদের নাগরিকত্বের দাবি।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র উ জ হতে’র কাছে ফাঁস হওয়া নথির সত্যতা নিয়ে জানতে চেয়েছিল দেশটির সংবাদমাধ্যম ইরাবতি। তবে ওই নথিগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানান জ হতে। তিনি শুধু বলেন, কে বা কারা নথিগুলো ফাঁস করেছে তা জানতে তদন্ত করা হচ্ছে। তারা জানতে পেরেছেন, অনেক সাংবাদিক ওই পেজটি অনুসরণ করেন।

জ হতে বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা করে দেখব যে ফেসবুক পেজটি জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট কেউ কিংবা কূটনীতিক অথবা সাংবাদিকদের কেউ তৈরি করেছেন কিনা। যদি তাদের কেউ এটা করে থাকেন, তবে সেটা হবে নীতিগত লঙ্ঘন। এর দায় তাদেরকে নিতে হবে। এটি একটি গোপন নথি।’ তিনি আরও জানান, এ নথি ফাঁসের ঘটনায় সরকারযথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ করবে এবং যদি জাতিসংঘের কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করবে। জ হতে স্বীকার করেছেন, এটাই প্রথম নথি ফাঁসের ঘটনা নয়। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির একটি ফাঁসকৃত কপিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়েছিল। এ ধরনের প্রবণতাকে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও জাতিসংঘের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকটির(এমওইউ) ফাঁস হওয়া অনুলিপি পর্যালোচনার পর রয়টার্স জানিয়েছে, সই হওয়া গোপন চুক্তিতে দেশটিতে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কিংবা সারা দেশে স্বাধীনভাবে চলাচলের কোনো প্রকাশ্য নিশ্চয়তা নেই। শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সমঝোতা স্মারককে উদ্ধৃত করে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,এতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। নাগরিকত্বের প্রশ্নের মীমাংসা কী হবে তাও স্পষ্ট নয়। প্রত্যাবর্তনকারী সবাইকে যথাযথ পরিচয়পত্রের কাগজ ও তারা যাতে স্বেচ্ছায় মুক্তভাবে ফিরতে পারেন, মিয়ানমার সরকারকে তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

চুক্তির খসড়া অনুযায়ী রাখাইনে অন্যান্য অধিবাসীদের মতোই প্রচলিত আইন মেনে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার ভোগ করবেন ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা। তবে রাখাইন রাজ্যের সীমানার বাইরেও তারা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে কিনা, সেই নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি। এমনকি বর্তমানে যে আইন ও নীতিমালা দিয়ে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাফেরার অধিকার রোধ করা হয়েছে, তা সংশোধনের প্রতিশ্রুতিও সেখানে নেই। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানেও নিশ্চিত করা হয়েছে, ৮২ সালে প্রণীত যে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের কার্যত রাষ্ট্রহীন করে রাখা হয়েছে, তা পর্যালোচনার কোনও পরিকল্পনা আপাতত নেপিদো নেই।