ad

কক্সবাজার জেলায় ১৯৫টি গণহত্যা

ডেস্ক রিপোর্ট ::
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার নতুন তথ্য উঠে এসেছে ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের জরিপে।ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জানিয়েছেন, কক্সবাজার, গাইবান্ধা, জামালপুর, নড়াইল, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, মৌলভীবাজার ও বরিশাল জেলায় ৪ হাজার ১৮০টি গণহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার তথ্য পেয়েছেন তারা।

“দশ জেলায় এই জরিপ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, আমরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বড় কম জানি। আমাদের মাথায় আধিপত্য বিস্তার করে আছে বিজয়। খালি বিজয় দেখলে মুক্তিযুদ্ধের যে নিদারুণ যন্ত্রণা, সেটা কিন্তু আমরা পাব না।”

শুক্রবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক সেমিনারে জরিপের তথ্য তুলে ধরে এ কথা বলেন মুনতাসীর মামুন।

এর আগে গতবছর মার্চে অন্য ১০টি জেলার জরিপের ফল প্রকাশ করেছিল গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট। তখন জানানো হয়েছিল, নীলফামারি, বগুড়া, নাটোর, কুড়িগ্রাম, পাবনা, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, নারায়ণগঞ্জ, ভোলা ও খুলনা জেলায় মোট এক হাজার ৭৫২টি গণহত্যার ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে জরিপে।

মুনতাসীর মামুন সে সময় বলেছিলেন, বিভিন্ন বইয়ে সারাদেশে গণহত্যার সর্বোচ্চ সংখ্যা পাওয়া যায় ৯০৫টি। কিন্তু জরিপে ১০ জেলার যে তথ্য তারা পেয়েছেন, তাতে ৬৪ জেলায় এই সংখ্যা দাঁড়াবে ধারণার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। সেক্ষেত্রে শহীদের সংখ্যাও হয়ত ৩০ লাখে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে এবারের জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ তো একটি রাজনৈতিক ব্যাপার। সেই রাজনৈতিক সত্যটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছি। আজকে গণহত্যার দিনটি জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করছি। এখন সবাই গণহত্যার কথা মনে রাখতে পারছে।”

বাঙালির মুক্তির আন্দোলনের শ্বাসরোধ করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সেই অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরে ঢাকায় চালানো হয় গণহত্যা। সেটাই শুরু।
২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। নয় মাসের যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

যুদ্ধের ওই নয়টি মাস এই ভূখণ্ডের নানা প্রান্তে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা।

পরাজয় নিশ্চিত জেনে আত্মসমর্পণের দুদিন আগে তারা পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ বহু খ্যাতিমান বাঙালিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার পর যেন বাংলাদেশ যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে- তা নিশ্চিত করা।

স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশকের মাথায় ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রকল্প ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’ সারা দেশে জেলাভিত্তিক এই জরিপ পরিচালনা করছে।

গতবছরের মত এবারও ১০ জেলার জরিপের ফলাফল নিয়ে ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ নামে ১০টি বই প্রকাশ করা হয়েছে এ প্রকল্প থেকে। সেমিনারে দুটি অধিবেশনে গণহত্যা জাদুঘরের ট্রাস্টি মো. মাহবুবর রহমান ও বীর প্রতীক কাজী সাজ্জাদ আলী জহিরের সভপতিত্বে ওই বইগুলোর তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়।

গাইবান্ধা জেলার জরিপ করেছেন জহুরুল কাইয়ুম। ‘একাত্তরে গাইবান্ধা’ বইয়ে তিনি তুলে এনেছেন ১৩৬টি গণহত্যা, ৯টি গণকবর, ১০টি বধ্যভূমি ও ৯টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ মোট ১৬৪টি গণহত্যার ঘটনা।
মামুন তরফদার ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস জামালপুর জেলা’ গ্রন্থে ১৯২টি গণহত্যা, ২২টি বধ্যভূমি, গণকবর ৩৩টি, ২১টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ ২৬৮টি গণহত্যার কথা তুলে ধরেছেন।

নড়াইল জেলার জরিপে ১৪৯টি গণহত্যা, ৬টি বধ্যভূমি, ৪টি গণকবর, ৫টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ মোট ১৬১টি গণহত্যা ও নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন অনুপ কুমার মণ্ডল।

লালমনিরহাটে আজহারুল আজাদ জুয়েলের জরিপে উঠে এসেছে ৫৬২টি গণহত্যা, ১৮টি বধ্যভূমি, ৮টি গণকবর, ১৩টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ মোট ৬০১টি নির্যাতনের কথা।

আলী ছায়েদের জরিপে পঞ্চগড় জেলায় ৬৪৯টি গণহত্যা, ৪টি বধ্যভূমি, ১৭টি গণকবর, ২৩টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ ৬৯৩টি গণহত্যার স্মৃতিচিহ্নের কথা এসেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার জরিপ করেছেন জয়দুল হোসেন। তিনি ৩৪৩টি গণহত্যা, ৩৫টি বধ্যভূমি, ১৮০টি গণকবর, ৯২টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ মোট ৬৪৯টি গণহত্যা ও নির্যাতনের নিদর্শনের কথা তুলে এনেছেন।

শংকর কুমার মল্লিকের জরিপে যশোরে ৫৮৯টি গণহত্যা, ৩৯টি বধ্যভূমি , ৩৩টি গণকবর, ৩৬টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ মোট ৬৯৫টি গণহত্যা ও নির্যাতনের তথ্য কথা এসেছে।

মৌলভীবাজারের ৩১৭টি গণহত্যা, ২৬টি বধ্যভূমি, ১৫টি গণকবর, ১৮টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ ৩৭৬টি গণহত্যা ও নির্যাতনের নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে তপন পালিতের জরিপে।

জগন্নাথ বড়ুয়ার জরিপে কক্সবাজার জেলার ১৯৫টি গণহত্যা, ২০টি বধ্যভূমি, ২৯টি গণকবর, ২৩টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ ২৬৭টি গণহত্যা ও নির্যাতনের তথ্য মিলেছে।

মনিরুজ্জামান শাহীনের জরিপে বরিশালের ২৪০টি গণহত্যা, ২০টি বধ্যভূমি, ২৩টি গণকবর, ২৩টি নির্যাতন কেন্দ্রসহ মোট ৩০৬টি গণহত্যা ও নির্যাতনের নিদর্শনের উল্লেখ রয়েছে।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সেমিনারে বলেন, “গণহত্যার রাজনীতি আছে। একাত্তরে পাকিস্তান এই রাজনীতি করেছিল আমাদের দমন করার জন্য, চিরদিনের জন্য আমাদের কলোনি করে রাখার জন্য।”

আর এখন ‘বিএনপি-জামাত চক্র’ গণহত্যা নিয়ে রাজনীতি করেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও পরে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাত্তরের গণহত্যার বিষয়টিকে বিস্মৃত করে দিতে চেয়েছেন।

“তারা গণহত্যার বিষয়টি মুছে দিতে চেয়েছেন। কারণটা হচ্ছে, গণহত্যার বিষয়টি থাকলে তাদের রাজনীতি থাকে না। কেননা তারা পাকিস্তানি ধারায় পাকিস্তানি এজেন্ডা পরিপূরণ করার জন্য রাজনীতি করছিলেন। গণহত্যার কথা থাকলে আল বদর, আল শামস বা রাজাকার বা অন্য যারা কাজ করছে, যারা এই খুনের সঙ্গে যুক্ত তাদের কথা চলে আসে।”

গণহত্যার দায়ে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করলে দেশে ‘জাতীয় ঐক্য‘ ফিরে আসবে বলেও মন্তব্য করেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এই ইতিহাসবিদ।

গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ শীর্ষক সেমিনারের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন