গ্রামকে শহর বানাতে এবার ২০ কোটি ডলার দিচ্ছে এডিবি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশের পাঁচ বিভাগের ১৮০ উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামো তথা সড়ক উন্নয়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ২০ কোটি ডলারের (১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা) ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১০ কোটি ডলার সহজশর্তে ও অবশিষ্ট ১০ কোটি ডলার নিয়মিত হারে বাংলাদেশকে ঋণ দেবে এডিবি। ফলে ’১৭ সালের বন্যায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে যাওয়া ২১ জেলার পল্লী এলাকার সড়ক ও জলবায়ু পরিবর্তনে ১৩ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারের আওতায় আসছে।

রবিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মনোয়ার আহমেদ ও এডিবির পক্ষে সংস্থার ঢাকা আবাসিক মিশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। প্রকল্পের বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এলজিইডির সুপারিনটেনডিং ইঞ্জিনিয়ার আলী আকতার হোসেন। তিনি জানান, চুক্তির আওতায় দেয়া অর্থ সফল ব্যবহারের মাধ্যমে পরবর্তীতে চুক্তি করবে এডিবি।

ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে গ্রামকে শহর বানানো। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেটি পূরণে সহায়ক হবে। সেই সঙ্গে এসডিজি ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মনমোহন প্রকাশ বলেন, ’১৮ সালে বাংলাদেশকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দিয়েছে যা বাংলাদেশের এ যাবতকালের সর্বোচ্চ এবং এডিবির সদস্য দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সহায়তা। তিনি বলেন, সড়ক সংস্কার বাংলাদেশের জন্য অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। সাধারণত সড়ক তৈরি হলেও অন্য প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কার বা ব্যবস্থাপনা করা হয়। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো এ প্রকল্পের মাধ্যমে এক সঙ্গেই সব কাজ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে গ্রামীণ কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশের পাঁচ বিভাগের ৩৪ জেলার মোট ১৮০ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ হবে। এর ২ হাজার ২১০ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক সংস্কার করা হবে। সংস্কারের আওতায় আসবে ৪৯৫ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক। বৃক্ষরোপণ করা হবে ২৫০ কিলোমিটার সড়কে। ’২৩ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)।

‘রুরাল কানেক্টিভিটি ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’-এর মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৬৮ কোটি ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা (২৮৫.৩১ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে এডিবি ঋণ হিসেবে দেবে ১ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। ১০ কোটি ডলার সহজশর্তে (অর্ডিনারি অপারেশন্স লোন-সিওএল), যার সুদের হার ২ শতাংশ। বাকি ১০ কোটি ডলার সহজশর্তে নয়, নিয়মিত (রেগুলার ওসিআর ভিত্তিতে সুদের হার) হিসেবে প্রদান করা হবে। এ ছাড়া শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ হারে ম্যাজরিটি প্রিমিয়াম ও অব্যয়িত অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ১৫ হারে কমিটমেন্ট চার্জ ওসিআর ঋণের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই ঋণ ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে পরিশোধ করতে হবে। গত ৯ অক্টোবর প্রকল্পটি একনেকের সভায় অনুমোদন পায়। উৎপাদনশীল কৃষি এলাকায় উচ্চ আয় সৃষ্টি ও আর্থ-সামাজিক কেন্দ্রে যাতায়াত সুগম করতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সংযোগ উন্নয়ন, সড়ক অবকাঠামো, জলবায়ু সহিষ্ণু ও আবহাওয়া উপযোগী করতে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। এর কাজ শেষ হলে ৫ কোটি ১৫ লাখ কৃষিনির্ভর মানুষ সুফল পাবে বলে ধারণা দিয়েছে এডিবি। এ বিষয়ে এডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সারা বছর সড়ক ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশের মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ। পল্লীর মাত্র ২৮ শতাংশ সড়ক বর্ষায় ব্যবহারের উপযুক্ত থাকে। ইউনিয়ন পর্যায়ের ৮৪ শতাংশ সড়ক এখনও কাঁচা। উপজেলা পর্যায়ে কাঁচা সড়কের হার ৩৩ শতাংশ। যাতায়াত অবকাঠামো ত্রুটিতে উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত গ্রামের মানুষ। ’২৩ সালের মধ্যে গ্রামের ৮০ শতাংশ সড়ক সারাবছর ব্যবহারযোগ্য করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে ২০ কোটি ডলার সহায়তা দেবে সংস্থাটি।

কৃষি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশে পল্লী সড়ক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষি খাতের হাত ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৫ শতাংশ এলেও এ খাতে মোট শ্রমশক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। এডিবির অর্থায়নে প্রকল্পটি সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নেয়া পল্লী সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে। এর ফলে পল্লী অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়বে। অর্থনৈতিক উন্নতিতে কৃষির অবদান বাড়াতে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ এখনও পল্লীতে বাস করেন। তাদের অধিকাংশই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। পল্লীর নাজুক পরিবহন ব্যবস্থা, বাজারে অংশ নেয়ার পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কয়েকটি দুর্বলতায় দেশের কৃষি খাত পিছিয়ে আছে।

প্রকল্পের আওতায় ৩৪ জেলা নির্বাচনে ’১৭ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এডিবি। জনসংখ্যা, কৃষির সম্ভাবনা, কৃষি ফার্মের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকল্পের আওতায় সড়ক নির্বাচন করা হয়েছে। এসব সড়কে বিভিন্ন ট্রাফিক চিহ্ন, পাহারা চৌকি, স্পীড ব্রেকার বানানোর উদ্যোগও থাকবে। কাজ শেষে পাঁচ বছর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের শর্তে সড়ক নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগের আট জেলা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী); ঢাকা বিভাগের পাঁচ জেলা (ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও শরীয়তপুর); খুলনা বিভাগের ছয় জেলা (চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর ও নড়াইল); রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা (বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহী) এবং রংপুর বিভাগের আট জেলার (রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও) মোট ১৮০ উপজেলার গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হবে।

ad