গণহারে স্থানীয়দের ছাঁটাই করছে ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও সংস্থাগুলো

মাহাবুবুর রহমান :
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত স্থানীয়দের চাকরী থেকে ছাঁটাই চলছে। ইতিমধ্যে বেশির ভাগ এনজিও থেকে স্থানীয় কোটায় চাকরী পাওয়াদের ছাঁটাই করে ফেলেছে। আর কিছু সংখ্যক যারা আছে তারাও নি¤œপদস্থ। মূলত প্রজেক্ট শেষ, বাজেট বরাদ্দ না থাকা এবং স্থানীয়দের মধ্যে যোগ্য লোক না থাকার কথা বলে স্থানীয়দের চাকরী থেকে গণহারে ছাঁটাই করছে এনজিও সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা। খবর দৈনিক কক্সবাজারের
কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ার বাসিন্দা নুরুল আবছার বলেন, আমি ৯ মাস থেকে একটি এনজিওর সাথে কাজ করছি। মুলত রোহিঙ্গা ক্যাম্প ভিত্তিক আমাদের কাজ। কষ্ট হলেও বেতন ভাতা ভাল ছিল হিসাবে কাজ করেছি। কিন্তু হঠাৎ করে সেই এনজিও থেকে আমাকে সহ আরো বেশ কয়েক জনকে বলা হলো ফেব্রুয়ারী মাস থেকে আমাদের আর চাকরী নাই। বিষয়টি নিয়ে আমরা সেই এনজিওর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা বলছে দাতা সংস্থার বাজেট বরাদ্দ শেষ হয়েছে। তাই প্রজেক্ট চলবে না আর যদি কোন মতে চলে তাও খুব সীমিত ভাবে চলবে তাই অনেককে চাকরীতে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু সেই এনজিওতে স্থানীয় ছাড়া আরো কমপক্ষে ৫০ জন উর্ধতন কর্মকর্তাদের নিকট আত্মীয় স্বজন আছে যারা বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে এসেছে কিন্তু তাদের কারো চাকরী যায়নি সবাই ঠিকই আছে। শুধু আমরা যারা স্থানীয় আছি আমাদের চাকরী নাই।
রামু এলাকার নাসরিন সুলতানা জানান, আমরা দরিদ্র পরিবারের সন্তান অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছি এর মধ্যে সুযোগ হলে এলাকার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটি আন্তর্জাতিক এনজিওর মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরী পায়। সেখানে সকাল ৮ টায় পৌছালে ফিরি সন্ধ্যার সময়। তার পরও মা বাবাকে কিছুটা আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য চাকরী করি। কিন্তু হঠাৎ করে শুনতে পাচ্ছি আগামী মাসে নাকি প্রজেক্ট বন্ধ হচ্ছে তাই আমাদের আর চাকরী থাকবে না। এটাও শুনছি শুধু স্থানীয় যারা আছে তাদেরকেই নাকি ছাঁটাই করা হবে। এছাড়া সেখানে ইতিমধ্যে অসংখ্য রোহিঙ্গাকে তারা চাকরী দিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গারা আমাদের সাথে খুবই বাজে ব্যবহার করে। আসলে মানুষ দূর থেকে দেখে বেশি বেতনে এনজিওতে চাকরী করা যায়। কিন্তু তারা যে গাধার মত খাটায় সেটা কেউ খবর রাখে না। এছাড়া আমরা যতই ভাল কাজ করি না কেন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মুখে সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না। অথচ এমন আছে সেই কর্মকর্তার ভাগ্নিকে যশোর থেকে এনে আমাদের উপরে সুপার ভাইজার পদে রেখেছে তাকে সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেয়, সে ৪ ঘন্টা কাজ করলেও কোন সমস্যা নাই।
তিনি বলেন, মূলত আমাদের যারা স্থানীয় লোকজনকে এনজিওতে চাকরী দিয়েছে ৯০% মাঠ পর্যায়ে। উচ্চ পদস্থ সব কর্মকর্তা ভিন্ন জেলার। সে জন্য আমাদের কথা বলার কেউ নাই। কিন্তু ঠিকই ভিন্ন জেলার ছেলে মেয়েরা চাকরী করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এমএসএফ এনজিওতে কর্মরত অন্তত ১০ জন স্থানীয় যুবক যুবতী বলেন, গত ২ দিনে আমাদের ৫০ জনের মত স্থানীয়দের বলে দিয়েছে আগামী ৩১ জানুয়ারী পর্যন্ত আমাদের চাকরী আছে পরের মাসে নাই এবং আমাদের স্থলে তারা রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দেবে। এটা সম্পূর্ন তাদের দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র, মূলত ইতি মধ্যে অনেক এনজিও থেকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা ভাল বেতনে ক্যাম্পে চাকরী করছে তারাই প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে সমস্ত ভুমিকা রাখে। মূলত আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করাতে তাদের অনেক ষড়যন্ত্রের কথা আমরা জেনে ফেলি সে জন্য তারা এখন রোহিঙ্গা যুবক যুবতীকে চাকরী দিয়ে তাদের মাধ্যমেই সমস্ত কাজ করাবে এটাই তাদের টার্গেট। আপনারা খবর নিলে জানতে পারবেন ইতি মধ্যে বেশির ভাগ এনজিও থেকে স্থানীয়দের গনহারে ছাঁটাইয়ে কাজ চলছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দেবে অথবা কক্সবাজারের বাইরে থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আত্মীয় স্বজন এনে চাকরী করাবে।
আলাপ কালে উখিয়ার সুজন সভাপতি নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, শুরু থেকেই আমি রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং স্থানীয়দের ক্ষতিপূরন এবং তাদের কাজে লাগানোর দাবিতে সোচ্চার আছি। গত কয়েক দিনে অনেক ছেলে মেয়ে আমাকে ফোন করে কান্না কাটি করছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থেকে তাদের চাকরী চলে গেছে সে জন্য। আমি নিজে খবর নিয়ে জানলাম এনজিওর কর্মকর্তারা বলছে প্রজেক্ট শেষ নতুন বরাদ্দ কম তাই কিছু ছাঁটাই করতে হচ্ছে। সেখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে যদি ১০০ জনের মধ্যে ২৫ জন স্থানীয় থাকে ৭৫ জন বাইরের তাহলে ছাঁটাই করতে হলে রেসিও অনুযায়ী করতে হবে অর্থাৎ ১০ জন স্থানীয় বাদ পড়লে ৩৫ জন বাইরের চাকরীজীবি বাদ পড়বে কিন্তু সেটা না করে ২৫ জনই স্থানীয়রা বাদ পড়ছে। এছাড়া উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আগে রোহিঙ্গাদের ভাষা বুঝতো না কিন্তু এখন অনেক বিদেশীও রোহিঙ্গার ভাষা শিখে গেছে তাই স্থানীয়দের বাদ নিয়ে তারা সরাসরি রোহিঙ্গাদের নিয়োগ করছে। এতে তারা সরকারের বিরুদ্ধে বা প্রত্যাবাসন বিরোধী সব কাজ নিজেদের মধ্যে করতে পারবে। এটা কোন ভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করতে হবে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আমি শুনেছি অনেক স্থানীয়দের চাকরী থেকে ছাঁটাই করা হচ্ছে। এটা শুধু আজকে নয় পান থেকে চুন খসলেই স্থানীয়দের চাকরী থাকে না। আর বহিরাগতরা অনায়াসেই থাকে। বর্তমানে প্রজেক্ট শেষ, বাজেট সংকট, যোগ্য লোক নাই এ সমস্ত বাজে কথা বলে স্থানীয়দের ছাঁটাই করা হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক এনজিও গুলোস্থানীয় এনজিওদের সাথে চুক্তি করে কাজ করার নিয়ম থাকলেও সেটা মানছে না। তারা নিজেরা বাইরে থেকে এনজিও হাইয়ার করে এনে তাদের সাথে কাজ করে এতে নানান ধরনের অনিয়ম করে। আর স্থানীয়দের নানান ভাবে বঞ্চিত করে। এবং সম্প্রতী অনেক স্থানীয় ছেলে মেয়েরা বলছে তাদের নাকি চাকরী আর থাকছে না।
এ ব্যাপারে শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ আবুল কালাম বলেন, স্থানীয়দের বাদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের চাকরী দেওয়ার কোন সুযোগ নাই। তবে হয়তো প্রজেক্ট শেষ হতে পারে সে জন্য হয়তো স্থানীয় কারো চাকরী নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

ad