রোহিঙ্গা ক্যাম্প জুড়ে বাংলা কারিকূলামে শিক্ষা দিচ্ছে ‘কোডেক’

শফিক আজাদ,উখিয়া::
বাংলা কারিকূলামে রোহিঙ্গা ছেলে- মেয়েদের শিক্ষা না দেওয়ার ব্যাপারে শিক্ষা অধিদপ্তরের সরাসরি নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছেনা এখানে। বিশে^র সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির কুতুপালংয়ে রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা ছেলে-মেয়েদের বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ বাংলা কারিকূলামে পাঠদান দিয়ে যাচ্ছে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ‘কোডেক’। এ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কোন মাথা ব্যথা না থাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় সচেতন মহলের মাঝে। স্থানীয়দের দাবী রোহিঙ্গা ছেলে- মেয়েরা যদি বাংলা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠে তাহলে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে।
জানা গেছে, ১৯৯২ সালে মিয়ানমারে ২০১৭সালের আগস্টের মত জাতিগত সংঘাত শুরু হলে মিয়ানমার থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলাদেশে। তখন বিভিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রোহিঙ্গা অবস্থান নিলেও কুটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বেশ সংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হন তৎকালীন সরকার। সেই সময় উখিয়ার কুতুপালংয়ে থেকে যায় প্রায় ১৪হাজার রোহিঙ্গা। যাহা বর্তমানে রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত। উক্ত রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গাদের ত্রাণ থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
সরজমিন কুতুপালং রেজিষ্ট্রার্ড ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষা প্রকল্পে কাজ করছে এনজিও সংস্থা ‘কোডেক’। তাদের ৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ৪/৫হাজার রোহিঙ্গা ছেলে/মেয়েকে নিয়মিত পাঠদান দেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ উঠেছে এসব রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলা কারিকূলামে বিভিন্ন পাঠ্য বই পড়ানো হচ্ছে বাংলায় শিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে। এমনকি ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত যেসব মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে তাতেও বাংলা কারিকূলামে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে ফেব্রুয়ারী মাসের মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ে বেশ কয়েকজন কর্মরত শিক্ষকের নিকট এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা কোন উত্তর না দিয়ে তাদের প্রজেক্ট অফিসার মোঃ জাহেদের সাথে যোগাযোগ করার কথা বলেন।
কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ‘কোডেক’ এর শিক্ষা প্রকল্পের প্রজেক্ট কো-অডিনেটর মোঃ জাহেদের নিকট এ ব্যাপারে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘কোডেক’ পরিচালিত কোন স্কুলে বাংলা কারিকূলামে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেন বাংলা শিক্ষার ব্যাপারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জিরো ট্রালারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এ প্রতিবেদকের নিকট থাকা প্রশ্নপত্র সহ বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করা হলেও তিনি আর কোন সদোত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।

এদিকে রোহিঙ্গা ছেলে/মেয়েদের বাংলা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২০১৭ সালের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান ক্যাম্প পদিরর্শন করে বলেছিলেন, উখিয়ার কুতুপালং-এ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত ক্যাম্পে বেশ কিছু এনজিও সংস্থা শিক্ষার্থীদের বাংলা পড়াচ্ছে যা বেআইনি। কোন অবস্থাতেই মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের বাংলা পড়ানোর সুযোগ নেই। এছাড়া মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের কোন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। বর্তমানে তা মানছেন না শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্তা-ব্যক্তিরা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ রায়হানুল ইসলাম মিয়া জানান, রোহিঙ্গাদের ছেলে/মেয়ের কোন প্রকার কারিকূলাম ভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছেনা, তাদের নিজস্ব তৈরী করা কাঠামোতেই পাঠদান দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও রোহিঙ্গা শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যবাসন কমিশনারের নিয়ন্ত্রিত ১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলা শিক্ষা দেওয়ার অনুমতি থাকলেও তারা কিন্তু কোন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করতে পারবেনা। বইয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, কোন প্রকার সরকারি বই রোহিঙ্গাদের দেওয়ার নিয়ম নেই। এরা হয়ত অন্য ভাবে ম্যানেজ করে শিক্ষা দিচ্ছে। কারণ বাজারে এখন সব ধরনের বই পাওয়া বের করেছে বিভিন্ন প্রকাশনী।

রোহিঙ্গা ছেলে/মেয়েদের বাংলা কারিকূলামে শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে কুতুপালং রেজিষ্ট্রার্ড ক্যাম্পের ক্যাম্প ইনচার্জ মোঃ রেজাউল করিম বলেন, রোহিঙ্গারা প্রথমে বাংলা শিক্ষা গ্রহন করতে চাইনি, আমরা জোর করে তাদেরকে বাংলা শিক্ষা দিয়েছিলাম, কিন্তু পরবর্তী যখন আমাদের ভূল আমরা নিজেই বুঝতে পেরেছি তখন বাংলা শিক্ষা দেওয়া বন্ধের উদ্যোগ গ্রহন করি। বর্তমানে ‘কোডেক’ এনজিও সংস্থা রেজিষ্ট্রার্ড ক্যাম্পে ৪/৫হাজার শিক্ষার্থীকে বাংলা কারিকূলামে শিক্ষা দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এটিতো আর দিনে দিনে সমাধান করা যাবেনা, তবে আমাদের ধীরগতিতে চেষ্টা করতেছি বাংলা শিক্ষা উঠিয়ে দেওয়ার জন্য।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, রেজিষ্ট্রার্ড বা আনরেজিষ্ট্রার্ড কোন ক্যাম্পে রোহিঙ্গা ছেলে/মেয়েদের বাংলা কারিকূলামে শিক্ষা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ রয়েছে। এই সংক্রান্ত অভিযোগে ভিত্তিতে আমি কয়দিন পূর্বে একটি এনজিও সংস্থাকে শোকজও করেছি।

ad