কার স্বার্থে কাজ করছে আরসা-আরএসও, রোহিঙ্গাদের ঘিরে সন্দেহজনক তৎপরতা

সমকাল::
মিয়ানমারভিত্তিক দুটি ‘উগ্রপন্থি’ সংগঠন আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জন্য। মিয়ানমার সরকার এরই মধ্যে আরসাকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশে আশ্রিত অধিকাংশ রোহিঙ্গা বিশ্বাস করে যে, আরসা ও আরএসও গোপনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর স্বার্থেই কাজ করছে। এমন তথ্যে বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার অনেক সদস্যও। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে আরসা ও আরএসওর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগজনক বেশকিছু তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বিতর্কিত এ দুই সংগঠন বিভিন্ন ধরনের নাশকতা ও হামলার ছক কষছে। বলা হয়েছে, কক্সবাজার অঞ্চলে কোনো কোনো পুলিশ চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে পারে- এমন শঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এমনকি দেশি-বিদেশি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আরসা-আরএসওর জড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তীক্ষষ্ট নজর রাখা হচ্ছে। তাই দুটি সংগঠনের কর্মকাণ্ডের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় প্রতিবেদনে। এ জন্য গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদও দেওয়া হয়েছে।

যদিও আরসা ও আরএসও বিভিন্ন সময় বিবৃতি দিয়ে দাবি করে আসছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে যে অত্যাচার চালিয়ে আসছে, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার তারা। তারা বলছে, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। নিজেদের ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে মনে করে না তারা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের মাটি কোনো উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যবহার করতে পারবে না। এ ব্যাপারে সরকারের নীতি জিরো টলারেন্স। আরসা বা আরএসওর মতো সংগঠনের ওপর তীক্ষষ্ট নজরদারি রয়েছে গোয়েন্দাদের।

টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা শিবির ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল মোতালেব বলেন, সাধারণ ও নিরীহ রোহিঙ্গারা আরসা এবং আরএসও কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো তথ্য জানে না। কারণ আরসা ও আরএসও সাধারণ রোহিঙ্গাদের স্বার্থে কাজ করছে- এমন কোনো নজির নেই। বরং মিয়ানমার সেনাক্যাম্পে আরসা হামলা করে, এ অভিযোগ তুলেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের পাশবিক নির্যাতন করে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। এখনও বাস্তুচ্যুত এই অনিশ্চিত জীবন যাপনের কারণ মূলত আরসা ও আরএসও।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, আরসার সদস্যরা জাল নোট তৈরি করে তা অপতৎপরতামূলক কাজে ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া ইয়াবা কারবারে জড়িত রয়েছে এই সংগঠনের সদস্যরা। এ থেকে প্রাপ্ত অর্থ তারা সংগঠনের কাজে ব্যয় করছে। এ দুই সংগঠন মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও অন্যান্য বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছে। সম্প্রতি দেশের বাইরে থেকে সাত কোটি টাকার একটি পলিসি প্ল্যান তৈরি করেছে আরসা। গোয়েন্দা সংস্থার আদলে নকল পোশাক বানানোসহ সদস্যদের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে তারা এ অর্থ ব্যয় করতে পারে বলে প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আদলে তারা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বাড়াতে ওয়াকিটকি সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া আরসার কার্যক্রমে যারা বিরোধিতা করছে, তাদের হত্যার চেষ্টাও করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের একটি অংশ মনে করছে, আরসা মিয়ানমারভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠন হলেও দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের গোপন সুসম্পর্ক রয়েছে। সংগঠনটির সক্রিয় সদস্য আনুমানিক ২৭০। আরসা আগে ‘ফেইথ মুভমেন্ট’ নামে তৎপরতা চালাত। তবে মিয়ানমারে স্থানীয়ভাবে তাদের পরিচিতি ছিল ‘হারকাহ্‌ আল ইয়াকিন’ নামে। অনেকের ধারণা, আরসার বর্তমান নেতৃত্বে রয়েছেন আতাউল্লাহ নামে একজন রোহিঙ্গা। আতাউল্লাহর বাবা রাখাইন থেকে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। আতাউল্লাহ করাচিতে জন্মগ্রহণ করলেও বেড়ে উঠেছেন সৌদি আরবে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন গোয়েন্দারা।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, আরসা মূলত গড়ে উঠেছে সৌদি আরবে চলে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে। আতাউল্লাহ ‘আবু আমর জুনুনি’ নামেও পরিচিত। রাখাইনের রোহিঙ্গারা যে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষা এবং আরবিতে অনর্গল বলতে পারেন তিনি। ২০১২ সালে আতাউল্লাহ সৌদি আরব থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। ২০১৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে আরসার প্রধানের ১৮ মিনিটের এক ভিডিওবার্তা প্রকাশ হয়। সেখানে তিনি মিয়ানমারের পুলিশ ক্যাম্পে হামলাকে ‘সমর্থন’ জানান। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হলেন মৌলবি হামিদ।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ আরও বলছে, মূলত রোহিঙ্গা যুবকদের দিয়েই গঠিত হয়েছে আরসা। তারা ‘আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের গেরিলা যুদ্ধে’র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। চরম দারিদ্র্য, নিজ দেশে স্বীকৃতি না পাওয়া ও চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণেই রোহিঙ্গারা এ পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে জানান, রোহিঙ্গা নারীদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতেই ‘উগ্রপন্থা’ বেছে নিয়েছে আরসা। তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়। কর্মকর্তা আরও বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গা নারীদের বিভিন্ন এনজিওসহ বিদেশি প্রতিষ্ঠান চাকরি দিচ্ছে। আরসা মনে করে- চাকরির নামে রোহিঙ্গা নারীরা আবারও ‘নির্যাতনের ফাঁদে’ আটকা পড়ছে। রোহিঙ্গা নারীদের এভাবে চাকরির নামে পুনর্বাসনের বিরোধী তারা।

সম্প্রতি উখিয়ায় হামিদ মাস্টার নামে এক রোহিঙ্গা খুন হন। ওই ঘটনার তদন্তে দেখা যায়, হামিদ মাস্টার প্রায়ই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসার জন্য সালিশ বৈঠক করতেন। সম্প্রতি একটি সালিশে এক তরুণীকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন তিনি। এতে ওই তরুণীর স্বামীর পক্ষ খুশি হলেও ক্ষোভে ফেটে পড়ে প্রতিপক্ষ। তারা তরুণীর পক্ষ নিয়ে হামিদ মাস্টারের ওপর হামলা চালায়। এতে মারা যান তিনি। ওই ঘটনায় জড়িতরা নিজেদের ‘আরসার সমর্থক’ বলে দাবি করে।

আরসা এবং আরএসওর সঙ্গে পাকিস্তান বা অন্য দেশের জঙ্গিদের যোগসূত্র রয়েছে কি-না সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন গোয়েন্দারা। থাইল্যান্ডের যে সূত্র থেকে তারা অস্ত্র পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে সে ব্যাপারে বিশদ তথ্য সংগ্রহ চলছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিক্ষিত ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন লোকজনকে টার্গেট করছে আরসা। তাদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে আরসার পক্ষে ‘ফতোয়া’ জারির জন্য চাপ দিচ্ছে। কয়েকটি যুক্তিতে আরসা ও আরএসওর কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়নের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথমে একটি স্লোগান দেয় আরসা। সেখানে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গারা গণহত্যার বিচার চায়। তারা মিয়ানমারে ফিরতে চায়।’ অল্প সময়ের মধ্যে ওই স্লোগানের কথা বদলে ফেলে আরসা। সেখানে নতুন করে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থাকতে চায়। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চায়।’

বাংলাদেশের গোয়েন্দারা বলছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্ররোচনায় রাতারাতি স্লোগান বদলে ফেলেছে আরসা। এতে স্পষ্ট, তাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আরসা ও আরএসও পৃথকভাবে কর্মকাণ্ড চালালেও যে কোনো সময় তারা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়াতে পারে- এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

আবার অনেকের বিশ্বাস, আরসা পরিকল্পিতভাবে মিয়ানমারের সেনাক্যাম্পে ‘হামলা’ চালিয়ে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করতে বাধ্য করেছে। আবার মিয়ানমারে নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গাড়িতে ফের হামলা চালায় আরসা। ওই ঘটনার জন্য আরসাকে দায়ী করা হয়। এতে আবার থমকে যায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। প্রত্যাবাসন কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করতে আরসা-আরএসও ‘মিয়ানমারের ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বলে মনে করা হয়।

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে রাখাইনের তিনটি পুলিশ ক্যাম্পে হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় আরসাকে দায়ী করে আসছে মিয়ানমার। ওই হামলার পর আবার অশান্ত হয়ে ওঠে রাখাইন। এরপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে। এর জেরে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নিষ্ঠুর পাশবিক নিপীড়ন চালানো হয়। ৭৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। ২০১৭ সালের আগস্টে একইভাবে মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১১ সদস্য নিহত হন। ওই প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। অভিযানে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা দলে দলে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়।

ad