ad

কাবিননামা নেই, আত্মসম্মান থাকবে কেন!

গোলাম মোর্তোজা::
ইউরোপের ভিসার জন্যে কাবিননামা দরকার! খুঁজে কাবিননামা পাই না। সেই কাজী অফিসের খোঁজ করতে গিয়ে দেখি কাজী অফিস নেই। কোথায় গেছে কেউ জানেন না। কাবিননামা ছাড়া ভিসা পাওয়া যাবে না। কাবিননামা না পেলেও, পাওয়ার বুদ্ধি দিলেন একজন। একজন কাজীকে অফিসে ডেকে আনলাম। চাহিদা অনুযায়ী পুরনো তারিখ দিয়ে কাবিননামা তৈরি করে দিলেন, নোটারি পাবলিক’র মাধ্যমে। ভিসা পেলাম। কিছুদিন পর পুরনো কাগজপত্রের ভিড়ে কাবিননামাও পেলাম। এখন কাবিননামা একটি নয়, দুটি।
আরেকজন প্রখ্যাত সাংবাদিকের কাছে জার্মান অ্যাম্বাসি ভিসা দেয়ার আগে কাবিননামা চাইল। খুঁজে পেলেন না। অ্যাম্বাসির প্রতিনিধিকে বললেন, কাবিননামা নেই।
বিয়ের কাবিননামা নেই?
‘কাবিননামা নেই, বউ নেই… কিছুই নেই। ভিসা দিলে দাও না দিলে পাসপোর্ট ফেরত দাও।’
জার্মান অ্যাম্বাসি তাকে ভিসা দিয়েছিল।

কিন্তু এই সাংবাদিক যদি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে স্ত্রীসহ ঘুরতে যাওয়ার পর ট্যুরিস্ট পুলিশ কাবিননামা চাইত? কী বিপদেই না পড়তেন তিনি, ‘অশালীনতা’র কী ভয়াবহ অভিযোগই না আনা হতো তার বিরুদ্ধে!

বানরের হাতে লাঠি তুলে দিলে, বানর ঠিক কী করে জানি না। তবে কোনো কিছু তুলে না দিলেও, পুলিশের কিছু সদস্য যে অনেক দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছেন, তাতে মানুষের জীবন অতিষ্ট।

বাংলাদেশ যারা পরিচালনা করেন, তারা কখনো বুঝে কখনো না বুঝে, অধিকাংশ সময়ে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে দেশের ইমেজের জন্যে অত্যন্ত ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। দেশের বাইরে যারা বাংলাদেশের মতো দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে চায়, তারা এতে সুযোগ পেয়ে যায়। রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামসহ অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। এই লেখায় সেই উদাহরণের দিকে যাব না। মানুষের যাপিতজীবনের কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলব। মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট বিষয়গুলো একটা দেশের পরিচিতি বা ইমেজে কতটা প্রভাব ফেলে এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

১. সাধারণ জনমানুষের অপমান-অসম্মানজনক ঘটনাগুলোর সুরাহা করার সুযোগ দেয় না রাজনীতি। সব সময় রাজনৈতিক আলোচনা মানুষের জীবনের ঘটনাগুলোকে চাপা দিয়ে দেয়। টাকা পাচারের অভিযোগ-উকিল নোটিশ, রংপুরের নির্বাচন… চাপা দিয়ে দিল কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ঘটে যাওয়া দম্পতির জীবনের চরম অসম্মানজনক ঘটনাটিকে। দুই দিনের মধ্যে আমরা সবাই ভুলে গেলাম। এই দম্পতি কি ভুলতে পারবেন, তাদের জীবনের এই অসম্মানের কথা! এই জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশ কি কোনও দিন বুঝবে সাধারণ এক নারী-পুরুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা? আপনি কি বুঝবেন!

কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে আপনি নিজেকে কল্পনা করেন। স্ত্রীকে নিয়ে বসে আছেন। পুলিশ এসে আপনাদের বলছে, ‘অশালীন’ কাজ করছেন। লোকজন জড়ো হয়ে গেল, সবাই জানল যে আপনারা ‘অশালীন’ কিছু করছিলেন। পুলিশ সবাইকে বলছে, আপনারা বিবাহিত দম্পতি নন। কাবিননামা দেখতে চাইছে, দেখাতে পারছেন না। মানুষ জড়ো হয়ে আপনাদের দেখছেন, পুলিশ সদস্যরা হাসছেন। অথবা ভাবুন নিজের মেয়ে বা ছেলেকে। সে তার স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে কক্সবাজারে গিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়ল। আপনাকে বলা হলো, তারা ‘অশালীন’ কাজ করছিল। কাবিননামা দেখাতে পারল না। আপনি গিয়ে তাদের পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করলেন। কেমন হবে আপনার মনের অবস্থা? ‘অপমান-অসম্মান’ শব্দ দিয়ে কি তা বোঝানো যায়?

২. মাঠপর্যায়ের একজন এসআই একদল পুলিশ নিয়ে গিয়ে ‘অশালীনতা’র অভিযোগ আনলেন দম্পতির বিরুদ্ধে। কাবিননামা চাইলেন। বিষয়টি এমন যে কাবিননামা নিয়েই তাদের সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার কথা। দেখাতে পারলেন না, আটকে রাখল পুলিশ। পরিবারের সদস্যরা গিয়ে ‘স্বামী-স্ত্রী’ এই মুচলেকা দিয়ে তাদের উদ্ধার করে আনলেন।

কেউ কেউ বলতেই পারেন, পুলিশের এসআই বিষয়টি বুঝতে পারেননি। অন্যায় করে ফেলেছেন। তার বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনভাবে ভাবা গেলে খুবই ভালো হতো। কিন্তু বিষয়টি এত ছোট এবং সরল নয়। বিষয়টির তাৎপর্য গভীর এবং জটিল।

সে রাতেই একটি টেলিভিশন টকশোর আলোচনায় টেলিফোনে সংযুক্ত হয়েছিলেন কক্সবাজারের ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান। ট্যুরিস্ট পুলিশ মানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্যটনবান্ধব পুলিশ, কনস্টেবল-এসআই-এসপি সবাই। নিশ্চিত করেই বলা যায় এই এসপি কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েই চাকরি পেয়েছেন।

পর্যটনবান্ধব প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত পুলিশ সুপার টেলিফোনে বলতে শুরু করলেন, ‘পাশের একজন পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল ওই দম্পতি ‘অশালীন’ভাবে বসে আছে। পুলিশ গিয়ে তাদের ঠিকভাবে বসতে বলে…।’ এটা কি বিচ্ছিন্ন একজনের বক্তব্য? মোটেই না। আমরা যে সমাজ তৈরি করছি, সেই সমাজের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি হচ্ছে একজন এসআইয়ের কাজে, এসপির বক্তব্যে।

এই দেশে দাপুটে নারী ফুটবলাররা ব্র্যান্ড না, ব্র্যান্ড কাবিনামার সন্ধান করা পুলিশ, ব্র্যান্ড আকায়েদ উল্লাহরা। যে দেশের একজন এসপি এই ভাষায় কথা বলেন, সেই দেশের মাঠ পর্যায়ের পুলিশ তো কাবিননামার সন্ধানই করবেন।

বিষয়টি লক্ষ্য করেন, ‘ঠিকভাবে’ বসতে বলা মানে কাবিননামা চাওয়া! আরও লক্ষ্য করেন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে স্বামী-স্ত্রী একটি ইজি বেঞ্চে বসে আছেন। তাদের পক্ষে কী বা কতটা ‘অশালীন’ কিছু করা সম্ভব? তারা হয়তো কাছাকাছি বসে ছিলেন, একজন আরেকজনের, হাতে বা কাঁধে হাত বা মাথা রেখেছিলেন, এই তো? ঘটনাটি ঘটছে সমুদ্র সৈকতে। এটাকে কেউ একজন বলছে ‘অশালীন’ আর করিৎকর্মা পুলিশ কাবিননামা চাইছে। মানে কাবিননামা সঙ্গে থাকলে এমন কিছু করলে তা ‘অশালীন’ হবে না? পুলিশের এসআই যা করেছেন, পুলিশ সুপার তা সমর্থন করে টেলিভিশনে কথা বলছেন। কোনটা ‘শালীন’ আর কোনটা ‘অশালীন’ সেই দায়িত্ব এই রাষ্ট্র তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব পুলিশকে দিয়েছে? পুলিশ নির্ধারণ করে দেবে ‘শালীনতা’র সংজ্ঞা? তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের জনগণ জীবনযাপন করবেন?

সমুদ্র সৈকতে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গিয়ে মানুষ প্রার্থনা করবেন, এমন সমাজ নির্মাণ করছি আমরা।

৩. কাবিননামা চাওয়ার বিষয়টি আসলে কী? এমন ঘটনা কি এই প্রথম ঘটল?

আমরা সবাই কম-বেশি জানি, বিষয়টি আসলে কাবিননামা চাওয়ার নয়, এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটল তেমনও নয়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বা বাংলাদেশের পর্যটন এলাকা, পার্কগুলোতে এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটে। পুলিশের দায়িত্ব থাকে ভ্রমণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার। এসব ক্ষেত্রে পুলিশ নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সব পুলিশ এমন করেন, তা নয়। ভালো পুলিশ অনেক আছেন, তারা অনেক ভালো কাজও করেন। তবে ওই এসআই বা পুলিশ সুপারের মানসিকতার পুলিশের সংখ্যা কম নয়। এরা ছেলেমেয়ে, দম্পতিদের টার্গেট করেন। বিশেষ করে প্রেমিক-প্রেমিকাদের টার্গেট করে, পরিবারকে জানিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় করেন। কাবিননামা চাওয়াটা সেই হুমকিরই অংশ।

অর্থ চেয়ে না পাওযায় কাবিননামার কথা বলে ইতিপূর্বে এক হিন্দু দম্পতিকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পুলিশ পিটিয়েছিল। উল্লেখ্য যে হিন্দুদের বিয়ের কাবিননামা হয় না।

৪. এবার আসি ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে। প্রথমে পুলিশ সুপার এসআইয়ের কাজকে সমর্থন করে কথা বললেন, তারপর কেন আবার সাময়িক বরখাস্ত করা হলো? সাময়িক বরখাস্ত করা হলো, কারণ ঘটনাটি গণমাধ্যমে উঠে আসল বলে। গণমাধ্যমে যদি বিষয়টি স্থান না পেত, কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হতো না। বা ব্যবস্থা নেওয়া হতো ওই দম্পতির বিরুদ্ধে। যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসে, লোক দেখানো কিছু ব্যবস্থা সেসব ক্ষেত্রে নেয়া হয়। প্রতিদিন এসব ঘটনা অনেক ঘটছে। ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে উপর থেকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

যারা ভাবছেন আপনি নিরাপদ, আপনার স্ত্রী বা মেয়ে নিরাপদ। হ্যাঁ, নিরাপদ। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে নিরাপদ। একবার কি একটু কষ্ট করে ভাববেন, আপনি বা আপনার স্ত্রী-মেয়ে কতদিন নিরাপদ থাকবেন? কালকে যে, আপনার মেয়ে কক্সবাজারের ওই দম্পতির মতো বা তার চেয়ে বাজেভাবে অসম্মানিত হবেন না, কোনও নিশ্চয়তা আছে? দাম্ভিকতা একটু সময়ের জন্যে হলেও পরিত্যাগ করুন। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন। তাকান আপনার বোন-মেয়ে বা স্ত্রীর দিকে। কক্সবাজারের ওই দম্পতির অবস্থানে ওদেরকে নিয়ে ভাবুন। ভাবতে পারছেন? স্বাভাবিক থাকতে পারছেন?

খুব ভালো করেই জানি, ক্ষমতার সংস্পর্শে থাকলে এসব ভাবার মতো সময় থাকে না। বিচ্ছিন্নভাবে যে ভালো থাকা যায় না, তা ভাবারও সময় থাকে না। এই ভাবনা থাকে না বলেই সমাজ অধঃপতিত হয়। পুলিশ কাবিননামা চায়, অশালীনতার দায়ে অভিযুক্ত করে উল্লাসে মেতে ওঠে।

৫. ‘অশালীনতা’র কথিত অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের যে বিদ্যুৎগতির পদক্ষেপ, তা যদি অন্যান্য ক্ষেত্রে দেখা যেত!

ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ হত্যা মামলার আসামিরা সংবাদ সম্মেলন করে-মিছিল করে-দিয়াজের পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্যে হুমকি দেয়, পুলিশ তাদের খুঁজে পায় না। দিয়াজের মা-বোন এক বুক হাহাকার নিয়ে বিচারের আশায় চোখের পানি ফেলেন। খেয়াল করে দেখেন, দিয়াজ কিন্তু ছাত্রলীগেরই নেতা ছিল।

ত্বকী হত্যা মামলার অভিযুক্ত পরিবারের জমজমাট বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হয়। ত্বকীর বাবা বিচারের আশা নিয়ে মানববন্ধন করেন। তনু হত্যার অভিযুক্ত আসামিরা নিরাপদ থাকেন, তনুর মা-বাবা পরিবারকে ঢাকায় তলব করা হয়, অভিযুক্ত আসামিদের নয়। উৎপল, অনিরুদ্ধদের কারা ধরে নিয়ে যায়, কোথায় আটকে রাখে, কারা ফেরত দেয়- কিছুই জানা যায় না। হয়তো এই দেশে তা জানার অধিকারই আপনার নেই। ফিরে আসলেই আনন্দে আত্মহারা হবেন। না ফিরে আসলে দেশ পরিচালনাকারীদের বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযুক্ত করতে পারবেন না। তারা কাবিননামার সন্ধান নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ভেবে নেবেন ‘অভিমান’ করে বেড়াতে গেছেন আপনার পরিবারের সদস্য। সব দোষ আপনার।

যারা নেই তাদের কথা মনে রাখারই দরকার নেই।

সাগর-রুনী, দীপন-অভিজিৎ নামে আসলে কী কেউ ছিল!

গুম হওয়া, ফিরে আসা, খুন হওয়া ভাই-বোন, মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের মনে রাখতে হবে প্রশ্ন করা যাবে না। পরিবারের জীবিত সদস্যদের অপমান-অসম্মান করার অধিকার দেশ পরিচালনাকারীদের দিয়েই হয়তো এদেশে বেঁচে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনি যে দেশে থাকেন সে দেশে আপনার বা আপনার মেয়ের-ছেলের বা স্ত্রী বা বোন বা মায়ের সম্মান বা আত্মসম্মান বলে কিছু থাকতে পারবে না। এদেশে ছাত্রনেতা ব্যাংকের মালিক হবে। দুর্নীতি নিয়ে ততটুকু কথাই বলা যাবে, যতটুকু বললে রাজনীতিতে সুবিধা পাওয়া যাবে। যুক্তি যতই থাক, তালগাছ কখন আপনার নয়।

আপনি ‘অশ্লীল’ আপনার মেয়ে-স্ত্রী ‘অশালীন’ যে কোনো সময় তারা বলতে পারবেন। একটি ফ্লাইওভার বা ব্রিজের দিকে, জ্যামে বসে থেকে আপনাকে খুশি থাকতে হবে। ‘সম্মান’ ‘আত্মসম্মান’ ‘মূল্যবোধ’ বলে কিছু থাকতে পারবে না।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন