করোনা, বেকারত্ব ও তথ্যপ্রযুক্তি : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মামুনুর রশিদ
বর্তমান বিশ্বে কোভিড-১৯ একটি আলোচিত শব্দ। ইতিহাস থেকে আমরা যেটুকু জানতে পারি, এক শতাব্দীতে একটি মহামারী হয়। একবিংশ শতাব্দীর মহামারীর নাম কোভিড-১৯ তথা করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাস পুরো বিশ্বব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। এটি গত বছরের শেষদিকে প্রথম শনাক্ত হয় চীনের ওহান শহরে। তারপর ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশে। পরিবর্তন আসে ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মানব জীবনের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে। বন্ধ হয়ে যায় বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। হঠাৎ স্থবির হয়ে পড়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবন। সামাজিক সম্পর্কের উন্নয়নের স্থলে
উল্টো সামাজিক দূরত্বের শ্লোগানই প্রচার পায় স্যোসাল মিডিয়াগুলোতে।

বিশ্বজুড়ে বন্ধ হতে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ সব রকমের সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত। শিল্প কারখানায় পণ্যের উৎপাদন কমতে থাকায় শ্রমিক ছাটাই শুরু হয়। ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হতে শুরু করলে বেকারত্বের সাথে-সাথে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয় সমগ্র বিশ্বে। প্রাণঘাতী ভাইরাসের ভয়ে দেশে দেশে জারি করা হয় জরুরি অবস্থার আদলে লকডাউন নামক নতুন পদ্ধতি। এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয় সরকারিভাবেই। প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায় সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন আর স্বাস্থ্যবিধি নামক নতুন জীবনপদ্ধতির সাথে মানুষকে পরিচিত ও অভ্যস্ত করে তুলতে।

২.
এদিকে এপ্রিল-মে মাসজুড়ে আমেরিকা ইতালি ও রাশিয়ার মত উন্নত দেশগুলোতে করোনা আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মৃত্যুর ঘটনা মিডিয়ায় আসতে থাকায় সাধারণ জনগণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গৃহবন্দী জীবন যাপন করতে শুরু করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অবসরের এই সময়ে পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষগুলো ব্যস্ততম জীবন ছেড়ে প্রিয়জনদের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেল। নয়টা পাঁচটা অফিস করা বাবা মাকে কাছে পেলো প্রিয় সন্তানগুলো। শিক্ষা কিংবা জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমানো সন্তানগুলো সুযোগ পেল মা বাবার সান্নিধ্যে জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতে।

৩.
সৃজনশীল তারুণ্য যখন করোনায় সরকারি সিদ্ধান্তে বেকার ও গৃহবন্দী। ঠিক তখনই তাদের মধ্যে উঁকি দেয় উদ্যোক্তা হওয়ার সুপ্ত প্রতিভা। যা সৃষ্টি করতে সহস্র প্রকল্ল হাতে নিয়েও কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সরকারি চাকুরির লোভ সামলিয়ে নিজের মেধা, শ্রম, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা দিয়ে স্বপ্নের ক্যারিয়ার সাজাতে।

শুরু হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তার নতুন নতুন পণ্যের সরগরম প্রচারণা। অনেকে হাসাহাসি করলেও ঠিকই লাভবান হয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ জীবনের লক্ষ্য পরিবর্তন করে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পথে প্রায় অনেকদূর এগিয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আক্ষরিক অর্থে বন্ধ থাকলেও বিশ্বের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জোম এপ্লিকেশনের প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম অভ্যাহত রাখলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পরবর্তীতে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় আসতে থাকে। যার ফলে ইনফরমেশন টেকনোলজি তথা তথ্য প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বাস্তব জীবনের অনেক কঠিন কঠিন কাজকেও খুব সহজে সমাধান করে অর্থ, শ্রম ও সময়ের অপচয় রোধ করতে শিখে গেছে।

ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত মিটিং ও ট্রেনিংয়ের একটি সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন প্লাটফর্ম। এসব মিটিং ও ট্রেনিংয়ের কার্যকারিতার শতাংশের সংখ্যা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক-বিতর্ক থাকলেও সদিচ্ছা থাকলে যে অনলাইনের মাধ্যমে খুব সহজেই সব কিছুর একটা সহজ সমাধানের পথে আনা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছে এই করোনা মহামারি।

মহামারির শুরুর দিকে আদালত ও বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলেও পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে বিচারব্যবস্থায়ও। দেশে সর্বপ্রথম বহুল প্রতীক্ষিত ই-জুডিসিয়ারি তথা অনলাইনে বিচারিক ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় করোনাকালীন সামাজিক দূরত্বের এই সময়ে। যা দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখন যদিও স্বাভাবিক আদালতে বিচার ব্যবস্থা শুরু হয়েছে, তথাপি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একটি বীজ বপন করে দিয়েছে করোনা।

৪.
মহামারির এই দুঃসময়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে বেশ কিছু আত্মহত্যা ও বিবাহ বিচ্ছেদের মত অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী হয়েছি আমরা। চাকুরিজীবী স্বামী হঠাৎ মাসের পর মাস গৃহবন্দী সময় কাটাতে গিয়ে প্রিয়জনের সাথে তর্কাতর্কি ও মনোমালিন্যের জের ধরে সম্পর্ক বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতান্তই অনভিপ্রেত। দীর্ঘ সময় কর্মহীন থেকে হাতাশাগ্রস্ত ও খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।
জীবনের স্বাভাবিক গতি অব্যাহত রাখতে ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নিতে হলে বিনোদন ও ঘুরাঘুরি কতটা যে গুরুত্বপূর্ণ তা মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের। টেলিভিশন ও পত্রিকায় শারীরিক সুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যবিধি প্রচারের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার দিকেও নজর দিতে পরামর্শ দিয়ে এসেছেন দেশের খ্যাতিমান মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ। সাধারণ জনগণের অনেকেই মহামারি প্রাদুর্ভাবের ফলে এতো বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন যে, তার ফলে মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে পারিবারিক কলহ বাঁধিয়ে নিজের জীবনে মহামারি ডেকে এনেছেন নিজেরই অজান্তে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত এই ছোঁয়াচে ভাইরাস আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হলো মানববিকতা ও সম্পর্কের গভীরতা। বৃদ্ধ মায়ের যখন করোনার উপসর্গ দেখা দিয়েছে সন্তান দূরে সরে গিয়ে জঙ্গলে ফেলে এসেছে মাকে। করোনায় সন্তানের মৃত্যুর পরেও এক বাবা লাশ কোলে নিয়ে হেঁটেছেন বহুদূর। জানাজা কিংবা শেষকৃত্যে অংশ নেয়নি বা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি অনেক আপনজন, যদিও মৃত্যু পরবর্তী লাশ থেকে ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে এখনো তর্ক চলমান। কোন আত্মীয় বিপদে পড়েও যদি কারো গৃহে যায়, সকলে নাক ছিটকানো আর ক্ষেত্রবিশেষে ঘরের দরজাও না খোলার মত অমানবিক, অতি সচেতনতার ঘটনাও হরহামেশাই দেখতে হয়েছে বিশ্ববাসীকে।

৫.
করোনা মহামারি নতুন এক জীবনধারার প্রচলন যেমন করেছে, মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ব্যবহারের গুরুত্বও বুঝিয়েছে। চাকরিচ্যুতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ সহ অর্থনৈতিক মন্দা যেমন সৃষ্টি করেছে, ঠিক তেমনই শিক্ষিত সমাজের মননে মগজে উদ্যোক্তা হয়ে নিজের কর্মসংস্থান নিজে সৃষ্টি করার সাহস যুগিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহারে সামাজিক অবক্ষয় যখন বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখরোচক আলোচনার বিষয় বলে তরুণ প্রজন্মের প্রতি নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিচ্ছে, ঠিক তখনই আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষা, ব্যবসা ও চিকিৎসার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পাদনের পথ নিয়ে চিন্তা করে সফল হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে এই করোনা মহামারি।

লেখকঃ
তরুণ প্রাবন্ধিক, শিক্ষানবিশ আইনজীবী।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন