করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত পঞ্চাশ কোটি শিশু

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনাভাইরাস মহামারী। যার কারণে বন্ধ রয়েছে বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে আক্রান্ত দেশগুলো চালু করেছে অনলাইন ক্লাস পদ্ধতি। প্রযুক্তির আশীর্বাদে অনেকটা সফলতা দেখিয়েছে এই অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা। ক্লাসের পাশাপাশি পরীক্ষা নেয়াও সম্ভব হয়েছে।

তবে জাতিসংঘের শিশু তহবিল, ইউনিসেফ বলেছে বিশ্বে স্কুলে পড়ছে এমন ছেলেমেয়েদের এক তৃতীয়াংশই অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণে অপারগ। সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় দেড়শ কোটি শিশু প্রত্যক্ষ শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৪৬ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর কাছেই নেই টেলিভিশন, রেডিও কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণের কোনো সাজ সরঞ্জাম। নেই বৈদ্যুতিক সুবিধাও।

ইউনিসেফের প্রকাশ করা ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনার কারণে দীর্ঘস্থায়ী জাতীয়গত এই লকডাউন প্রভাব ফেলেছে প্রায় দেড় বিলিয়ন শিক্ষার্থীর উপর। সামর্থ্য অনুযায়ী যারা পারছে তারা এই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিয়ে পারলেও শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে অনেক শিক্ষার্থী। সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের আফ্রিকা অঞ্চলে ৪৯ শতাংশ শিশুই অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বঞ্চিত। এই সংখ্যা পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় ৪৮ শতাংশ, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ৪০ শতাংশ।

এছাড়াও দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল মিলিয়ে বিশ কোটি ছাত্রছাত্রী শ্রেণী কক্ষের বাইরে থেকে কোনো রকম শিক্ষা গ্রহণে সমর্থ নয়।

মূলত দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েরা ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী শিশুরা দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী দরিদ্রতর পরিবারগুলো থেকে আসা শতকরা ৭২ ভাগের বেশি স্কুলগামী এই অনলাইন শিক্ষা জগতে প্রবেশ করতে পারছে না। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর দরিদ্র পরিবারগুলোর ৮৬ ভাগ স্কুলছাত্রই অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ করতে অক্ষম। যার পরিমাণ বিশ্বব্যাপী স্কুলগামী শিক্ষার্থীর এক তৃতীয়াংশ।

বয়সভিত্তিক দেখা যায়, প্রাক-প্রাথমিক বয়সের ৭০ ভাগ স্কুলছাত্রী ভার্চুয়ালি শিক্ষা গ্রহণ করছে না। যাদের সংখ্যা প্রায় ১২০ মিলিয়ন। সম্ভবত ছোট বাচ্চাদের জন্য অনলাইন ক্লাস করা চ্যালেঞ্জের বিষয়। এছাড়াও নানা সীমাবদ্ধতার কারণেও তারা এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যেমন, অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে অজ্ঞতা। প্রোগ্রামের অভাব। অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ডিভাইসের অভাব। এরপর আসা যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তালিকায়। এই বয়সের ২১৭ মিলিয়ন শিক্ষার্থী অনলাইন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। শতকরা হিসাবে যার পরিমাণ কমপক্ষে ২৯ শতাংশ। এদিকে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম না থাকায় কমপক্ষে ১৮ শতাংশ বা ৪৮ মিলিয়ন উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলছাত্র অনলাইনে তাদের পড়ালেখা চালাতে পারছে না।

করোনাভাইরাসের কারণে গত মার্চে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সরকার। এপ্রিল পর্যন্ত ঈদসহ নানা ছুটির কারণে মে মাস থেকেই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর কাজ শুরু করে অনেক স্কুল। সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের আগে থেকে বেসরকারি স্কুলগুলো বিশেষ করে ইংরেজি মিডিয়াম বা উভয় মাধ্যমের পরিচিত স্কুলগুলো ফেসবুক বা জুম ব্যবহার করে অনলাইন পাঠদান শুরু করে।

তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি সুবিধাবঞ্চিত রয়েছে দেশের অনেক শিক্ষার্থী। সরকারি হিসাব মতে দেশে প্রাথমিক স্কুল আছে ৬৪ হাজার। আর অন্যদিকে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে মাধ্যমিক স্কুল আছে আরো সতের হাজারের মতো। আর কলেজ বা মহাবিদ্যালয় আছে প্রায় আড়াই হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। যাদের মধ্যে মাত্র ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীই করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। ভালো সংবাদ হচ্ছে সরকার এর সংখ্যা কমাতে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই সুবিধাবঞ্চিত এসব শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন