কক্সবাজারে বছরে শুধু ব্যাংকেই নগদ লেনদেন হয় ৭৫ হাজার কোটি টাকা

দেশে নগদ অর্থের লেনদেন অন্যান্য অনেক জেলার চেয়ে বেশি হচ্ছে কক্সবাজারে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে দেশে ব্যাংকের মাধ্যমে নগদ অর্থের লেনদেন হয়েছে ১১ লাখ ৭১ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজার জেলায়ই লেনদেন হয় ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে দিনে ১০ লাখ টাকার বেশি নগদ জমা বা উত্তোলন হলে তার জন্য বিএফআইইউতে রিপোর্ট করতে হয়। এ ধরনের লেনদেনকে ‘ক্যাশ ট্রানজেকশন্স’ বা নগদে লেনদেন বলে অভিহিত করে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটি। দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নগদ লেনদেনের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কক্সবাজারের নাম আছে সবার শীর্ষে। শুধু ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলাটিতে ব্যাংকের মাধ্যমে নগদ লেনদেন হয়েছে ৭৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। অথচ দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা রাঙ্গামাটিতে গত অর্থবছরে মাত্র ৫৪৭ কোটি টাকা নগদ লেনদেন হয়েছে। দেশের স্থলবন্দরসমৃদ্ধ সীমান্তবর্তী অন্য জেলাগুলোতে যে পরিমাণ নগদ লেনদেন হয়, কক্সবাজারে হচ্ছে তার চেয়ে অন্তত ছয় গুণ বেশি।

কক্সবাজারে কেন এত বেশি পরিমাণ নগদ লেনদেন হয়, তার কারণ অনুসন্ধান করেছে বণিক বার্তা। জেলাটিতে দায়িত্বপালনকারী ব্যাংকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, বিএফআইইউ, গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা উদ্বেগই বাড়াচ্ছে। তারা বলছেন, কক্সবাজারে নগদ লেনদেনের বড় অংশই অবৈধ অর্থ। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এ জেলা দেশে ইয়াবা চোরাচালানের মূল কেন্দ্র। মাদক বিক্রি ও মানব পাচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হচ্ছে। যদিও অবৈধ অর্থের বড় অংশই লেনদেন হচ্ছে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে। এছাড়া পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের অনেকগুলো বড় উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এটিও জেলাটিতে নগদ লেনদেন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

কক্সবাজারে নগদ অর্থ লেনদেনের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ের বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। তার ভাষ্য, কক্সবাজার এখন ইয়াবাসহ মাদক চোরাচালানের মূল রুট। এ কারণে জেলাটির এক শ্রেণীর মানুষের হাতে অর্থের অভাব নেই। পাশাপাশি পর্যটন, রোহিঙ্গা ও সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে জেলাটিতে নগদ অর্থের লেনদেন বেশি হচ্ছে। মানি লন্ডারিংসহ আর্থিক অপরাধ বাড়লে নগদ অর্থের লেনদেনও বাড়ে।

আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, চেকের মাধ্যমে লেনদেন হলে তার উৎস ও গন্তব্য সহজেই চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু নগদে কেউ ব্যাংকে টাকা জমা দিলে কিংবা উত্তোলন করলে তার উৎস ও গন্তব্য চিহ্নিত করা কঠিন। কক্সবাজারে নগদ অর্থের লেনদেন কমাতে এরই মধ্যে আমরা ব্যাংকারদের নিয়ে টাউন হল মিটিং করেছি। জেলাটিতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনজিওগুলোর সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। অবৈধ অর্থের দাপট কমাতে হলে নগদ লেনদেন কমাতে হবে।

বিএফআইইউর তথ্য অনুসারে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে নগদ অর্থের লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজারটি। এসব লেনদেনের মাধ্যমে ১১ লাখ ৭১ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা নগদে জমা বা উত্তোলন করা হয়েছে। মোট নগদ লেনদেনের ৪৬ শতাংশ হয়েছে ঢাকা বিভাগে। আর চট্টগ্রামে ১৭, খুলনায় ৯ ও রাজশাহীতে হয়েছে ১১ শতাংশ লেনদেন। রংপুরে হয়েছে মোট নগদ লেনদেনের ৭ শতাংশ। এছাড়া ময়মনসিংহে ৪, সিলেট ও বরিশালে লেনদেন হয়েছে ৩ শতাংশ।

পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রাম বিভাগে গত অর্থবছর নগদ লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই ৭৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা নগদ লেনদেন হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় প্রায় ৩ কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে কক্সবাজারের জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। সে হিসাবে কক্সবাজার জেলায় বসবাস করে চট্টগ্রাম বিভাগের মাত্র ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ। অথচ চট্টগ্রাম বিভাগটিতে নগদ লেনদেনের ৩৭ শতাংশ হয়েছে কক্সবাজার জেলায়।

সোনালী ব্যাংকের কক্সবাজার শাখার ব্যবস্থাপক ওসমান গণি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকার কক্সবাজারের বিপুল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ করছে। জমির বিপরীতে মানুষের হাতে টাকা আসছে। জেলায় নগদ লেনদেন বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে এটিও একটি কারণ হতে পারে।

ইয়াবা বিক্রিসহ অবৈধ টাকার ছড়াছড়ি কক্সবাজারে নগদ লেনদেন বেশি হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ঢাকা ব্যাংকের কক্সবাজার শাখার ব্যবস্থাপক একেএম আমিনুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ লাখ টাকার বেশি নগদ লেনদেনে সতর্ক থাকার কথা বলেছে। কিন্তু আমি ঢাকা ব্যাংকের কক্সবাজার শাখায় লাখ টাকার বেশি নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করি। গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকার উৎস ও সুবিধাভোগীর বিষয়ে জানার চেষ্টা করি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় ব্যাংকের শাখাগুলোতে বর্তমানে জমা আছে গ্রাহকদের ১০ হাজার ৫৮২ কোটি টাকার আমানত। জেলাটিতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে আমানতের তুলনায় বিনিয়োগে পিছিয়ে আছে জেলাটি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি মাসেই আমি কক্সবাজার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এখনো জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারিনি। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, পর্যটন ও রোহিঙ্গাদের কারণে জেলায় নগদ টাকার লেনদেন বেশি হতে পারে। তবে যেকোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড ও অবৈধ টাকার লেনদেন বন্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সবকিছু করা হবে।

কক্সবাজারে নগদ অর্থের ছড়াছড়ির ক্ষেত্রে ইয়াবা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্যও। তবে তাদের কেউ এ বিষয়ে গণমাধ্যমে মন্তব্য করতে রাজি হননি। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, কক্সবাজার দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র। পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে বড় সীমান্তবর্তী এলাকাও। জেলাটি দীর্ঘদিন থেকেই ইয়াবাসহ মাদক পাচারের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। সামগ্রিক বাস্তবতায় কক্সবাজারে নগদ টাকার ছড়াছড়ি হওয়াটি অস্বাভাবিক নয়। জেলাটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা অপরাধ দমনে র্যাব কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এজন্য কক্সবাজারে র্যাবের একটি ব্যাটালিয়নও স্থাপন করা হয়েছে। ব্যাটালিয়ন স্থাপনের পর র্যাব জেলাটিতে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে।

কক্সবাজারের মতোই সীমান্তবর্তী পর্যটনসমৃদ্ধ জেলাগুলোর একটি সিলেট। জেলাটিতে রয়েছে তামাবিল স্থলবন্দরও। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট জেলায় নগদ অর্থের লেনদেন হয়েছে ১৩ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে নওগাঁয় ১৩ হাজার ২৭০ কোটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১২ হাজার ২১৭ কোটি, ফেনীতে ৮ হাজার ৫২৪ কোটি, চুয়াডাঙ্গায় ৭ হাজার ৩০০ কোটি এবং সাতক্ষীরায় ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকার নগদ লেনদেন হয়েছে। নগদ লেনদেন কম হলেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিচারে কক্সবাজারের তুলনায় এসব জেলা পিছিয়ে নেই বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সুত্র: বনিক বার্তা

Loading...
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন