কক্সবাজারের প্রার্থীদের অনেকেই লবিংয়ে ঢাকায়, কেউবা মাঠে

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ::

পর্যটননগরী কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে মনোনয়ন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা লবিং করতে অবস্থান করছেন ঢাকায়। তবে কেউ কেউ মাঠেও তৎপর রয়েছেন।

কক্সবাজার জেলার যে কটি সংসদীয় আসন রয়েছে, তার মধ্যে উখিয়া-টেকনাফ আসনটি বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে নাফ নদী ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায়। ভৌগোলিক দিক থেকে এর পূর্বে মিয়ানমার, দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে কক্সবাজার জেলা সদর। কক্সবাজার-৪ উখিয়া-টেকনাফ আসনটিতে আছেন সরকার দলীয় এমপি আবদুর রহমান বদি। অবশিষ্ট ৩ আসনে চকরিয়া-পেকুয়া জাতীয় পার্টি এবং ২টিতে রয়েছেন সরকারদলীয় এমপি যথাক্রমে সাইমুম সরোয়ার কমল ও আশেক উল্লাহ রফিক। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীর অনেকেই ঢাকায় লবিং নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

জেলার চারটি আসনের স্থানীয় বাসিন্দাদের (ভোটার) সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দল ক্ষমতায় থাকায় বেশ কিছু লোক আওয়ামী লীগের এমপি হতে মনোনয়নের জন্য মাঠে নেমেছেন। লবিং করছেন ঢাকায়। এলাকায় তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই না করে মনোনয়ন দেয়া হলে বর্তমানে মাঠে ধরে রাখা ফল পরের ঘরে চলে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ভোটাররা। জেলার ৪টি আসনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা স্ব স্ব দল থেকে মনোনয়ন নিয়ে ভোটযুদ্ধে লড়বেন। অন্য দল থাকলেও কক্সবাজার জেলায় ওই তিনটি রাজনৈতিক দল মাঠে-ময়দানে চাঙ্গা রয়েছে। চকরিয়া-পেকুয়া কক্সবাজার-১, মহেশখালী-কুতুবদিয়া কক্সবাজার-২, কক্সবাজার সদর-রামু কক্সবাজার-৩ এবং উখিয়া-টেকনাফ কক্সবাজার-৪। এ চারটি আসনের মধ্যে উখিয়া টেকনাফের আসনটিকে ভাগ্যবান আসন বলে থাকেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। কেননা, সংসদীয় সরকারের অধীনে ২৯ বছর ধরে উখিয়া-টেকনাফ আসনে যে দলের প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, ওই দলই সরকার গঠন করে আসছে এ পর্যন্ত। এ জন্য এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে তুমুল প্রতিযোগিতা হতে পারে। কক্সবাজার-১ চকরিয়া-পেকুয়া আসন নিয়ে বিএনপির প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা একদম টেনশনমুক্ত। এ আসনের সাবেক এমপি সালাহ উদ্দিন আহমেদ ভারতে বেকসুর খালাস পাওয়ায় আরও বেশি আগ্রহী হয়ে রয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। দলীয়ভাবেও চকরিয়া-পেকুয়ায় সুসংহত ও শক্তিশালী বিএনপি। বারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ৪৫ বছর ধরে এ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ের মুখ দেখেনি। ১৯৭৩ সালের পর থেকে এ আসনে আওয়ামী লীগ দেখেনি জয়ের মুখ। মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগের এক নেতার বিরুদ্ধে দখলবাজিসহ বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ দেশে ফিরলে বিএনপির জয়জয়কার অবস্থা হয়ে দাঁড়াতে পারে এ আসনে। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ৪ মনোনয়ন প্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে। তারা হলেন- সালাহ উদ্দিন আহমদ, রেজাউল করিম, জাফর আলম ও আশরাফুল ইসলাম সজিব। অপরদিকে জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য হাজি মোহাম্মদ ইলিয়াছের বিরুদ্ধে চকরিয়ার এক সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকিসহ গালমন্দ করার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে কিছু কিছু ভোটার। ওই সাংবাদিক সংসদ সদস্য ইলিয়াছের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় জিডি দায়ের করেছেন।

ad

কক্সবাজার-২ মহেশখালী-কুতুবদিয়ার ঘরে ঘরে আওয়ামী লীগের দুর্গ গড়ে উঠেছে বর্তমানে। মাতারবাড়িতে দুটি কয়লাতাপ বিদ্যুতকেন্দ্রসহ ব্যাপক উন্নয়ন ও সম্প্রতি ৯৪টি অস্ত্রসহ ৪৩ দস্যুকে আত্মসমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে এনে দেয়ায় স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের যথেষ্ট সুনাম বয়ে চলেছে মহেশখালী-কুতুবদিয়ায়। মহেশখালী-কুতুবদিয়ায় কয়লা তাপবিদ্যুত কেন্দ্রসহ বিভিন্ন উন্নয়নের কারণে এ আসনটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ইতিহাসে বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন এই মহেশখালীতে। প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত প্রকল্প নির্বিঘেœ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে এবারে দলীয় হাইকমান্ড যাচাই করে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। বর্তমান সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, ড. আনসারুল করিম, সাবেক ছাত্রনেতা মোঃ ওসমান গণি এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতে পারে। এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে কেন্দ্রীয় নেতা মুহিব উল্লাহর মনোনয়ন নিশ্চিত বলেও জানা গেছে। এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী। স্থানীয়রা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু গদিতে বসে থাকেন না, গ্রামের খবরও রাখেন। ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, সাত সহস্রাধিক গুলিসহ ৪৩ কুখ্যাত দস্যুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন। তাই আওয়ামী লীগকে (নৌকায়) ভোট দিতে সাধারণ ভোটারগণ স্বউদ্যোগে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে মহেশখালীতে।

কক্সবাজার-৩ সদর ও রামু আসনটি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, মেরিনড্রাইভ, আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসন। আসনটি আওয়ামী লীগের জন্য হিসাবে ধরে নেয়া যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন ভোটাররা। কক্সবাজার সদর ও রামু আসনে প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী কানিজ ফাতেমা, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের নেত্রী নাজনিন সরওয়ার কাবেরী। এ আসনে বিএনপি দলের সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে কোন আলোচনাও নেই। নেই কোন টেনশন। লুৎফুর রহমান কাজলকে বিএনপির একক প্রার্থী বলেই ধরে নিচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থীর তালিকায় আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, তার শ্যালক উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, মেজর (অব) মোঃ আবু তাহের, সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও তাঁতী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাধনা দাশ গুপ্তা। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী একমাত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপি সভাপতি শাহাজাহান চৌধুরীকে একক প্রার্থী বলে জানিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে নড়বড়ে ও ভেঙ্গেপড়া ব্রিজগুলোর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ায় পাল্টে গেছে টেকনাফ ও উখিয়ার গ্রামীণ জনপদ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের এসব ব্রিজ নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সীমান্ত বাণিজ্যের পণ্যবাহী ট্রাক অতিক্রম করার সময় মরিচ্যা ব্রিজ ধ্বসে গাড়িসহ খালে পড়ে চালক নিহতসহ বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। অকালে ঝরে গেছে একাধিক তাজা প্রাণ। নির্মাণ না করে ওসব ভাঙ্গা ব্রিজ কোনমতে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়েছে তৎকালীন সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের পর জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্রিজ বাস্তবায়ন করায় টেকনাফ ও উখিয়ার অবহেলিত গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন উপকারভোগী এলাকার জনসাধারণ।

উত্তর গয়ালমারা জামবনিয়াছড়ার ওপর নির্মিত ব্রিজ ঘুরে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওসব এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ছড়ার ওপর তৈরি করা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করেছে। গ্রামবাসী জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার এই ব্রিজটি নির্মাণের ফলে এলাকার প্রায় ৫ হাজার মানুষ, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসাগামী ছাত্রছাত্রী যানবাহনে যাতায়াত করতে সক্ষম হয়েছে। ব্রিজটি জনগণের অনেক উপকারে এসেছে।