বিদায় ২০১৭

আলোচিত চরিত্র রোহিঙ্গা

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দেন- ফাইল ছবি

মাদার অব হিউম্যানিটি শেখ হাসিনা

অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম::

২০১৭ সালের আলোচিত চরিত্র ছিল রোহিঙ্গা। দেশ-বিদেশে- জাতিসংঘ থেকে ওআইসি বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, প্রতিটি ফোরামে আলোচনার কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা। সেইসঙ্গে অবধারিতভাবেই প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশের ভূমিকা। নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে।

রোহিঙ্গা সংকট বছরের ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতে আমাদের প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ভারত আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা অনেকটা সে রকমই। ব্রিটিশ শাসন থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই বার্মা সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ ও চক্রান্তের মধ্য দিয়ে সে দেশের ইতিহাস থেকে রোহিঙ্গাদের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে আমরা প্রথমবারের মতো এই সংকটের মুখোমুখি হই। বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গারা সে দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আবার আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে মিয়ানমার সরকার তাদের ফিরিয়েও নিয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে এসে এটা চরম আকার ধারণ করেছে।

১৯৭৭ সালে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সব রোহিঙ্গাকে ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা) সরকার ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ করেনি বলেই এরপরও কয়েক দফায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ফিরে যেতে পারলেও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশেই থেকে যায়।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আবারও নির্যাতন শুরু হলে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। যার সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। আর পুরনো-নতুন মিলিয়ে এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে কষ্টসাধ্য হলেও মানবিক কারণেই রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার ঘোষণা দেন।

আমাদের মতো ছোট একটা দেশের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় দেওয়া সাহসের ব্যাপার, একই সঙ্গে ঝুঁকিরও। অনেক বড় দেশ তো আছে, তারা বছরজুড়ে মানবতার কথা, মানবাধিকারের কথা ফলাও করে বলে বেড়ায়। কই, তারা তো কেউ জোরালোভাবে এগিয়ে আসেনি? মালয়েশিয়াসহ কিছু দেশ সহায়তা দিয়েছে কিন্তু সেটা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্ত ক্ষুদ্র পরিসরে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা অন্তত মাথা গোঁজার একটু আশ্রয় পেয়েছে, দু’বেলা খাবার পাচ্ছে, চিকিৎসা পাচ্ছে। এই যে মানবতার সেবা, এর তুলনা নেই। এটা বর্তমান সরকার, আরও নির্দিষ্ট করে বললে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসীম সাহস এবং বিশাল মানবিক হৃদয়ের জন্যই সম্ভব হয়েছে।

শুরুতে সরকার পরিস্থিতি বিচারে আগে-পিছে ভাববার জন্য কিছুটা সময় নিচ্ছিল। তখন সমালোচনা হলো- সরকার রোহিঙ্গাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার যখন আসতে দিল তখন বলছে, বাংলাদেশের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে গেল, বন-জঙ্গল, পাহাড় সাফ হয়ে গেল। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে- কেন তাদের আশ্রয় দেওয়া হলো। অথচ এটা ছিল মানবতার জন্য বড় একটা কাজ। বিশ্ব তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্ববাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘গড়ঃযবৎ ড়ভ ঐঁসধহরঃু’ অভিধায় অভিষিক্ত করেছে।

শুধু এক বছরের কার্যকলাপ দিয়ে একজন মানুষকে বিচার করা যায় না। যদি বিচার করতে হয় তিনি যখন থেকে এ দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন, তখন থেকে তার যে অবদান বা সফলতা তার কথা বলতে হয়। শেখ হাসিনা প্রথম যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি পেল ইউনেস্কো কর্তৃক। এটা একটা বড় সাফল্য ছিল। এ ছাড়াও তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। তবে তিনি যে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন, এটা তো আমরা বুঝতামই না যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ কী। এখন তো এটা সবাই জেনে-বুঝে ব্যবহার করছে। আমাদের এখন মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা এগারো কোটির ওপরে। ইন্টারনেট সুবিধা ইউনিয়ন পর্যায়ে চলে গেছে। এটা কি আমরা আগে ভাবতে পেরেছি? আবার শিক্ষার দিকে যদি তাকাই, শিক্ষার যে বিস্তার বা প্রসার- বিশেষ করে নারীশিক্ষা। এখন কিন্তু মেয়েরা ছেলেদের সমান সমান নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠও বটে। শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি, তার সঙ্গে পোশাক শিল্পে নারীর শ্রম দিয়ে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে কিন্তু নারীমুক্তি বা নারী জাগরণও ঘটে যাচ্ছে।

যতবারই ক্ষমতায় এসেছেন কিছু ঐতিহাসিক কাজ শেখ হাসিনা করেছেন। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু পরিবার, জাতীয় চার নেতাসহ মুক্তিযোদ্ধা হত্যার বিচার, যা তিনি সম্পন্ন করেছেন। তার আরেকটা সাফল্য, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার। তার সরকারের সময়ই শুরু হয়েছে এই বহুকাঙ্ক্ষিত বিচার। ১৯৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের অনেকের বিচার এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তারা শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছে। অপরিসীম সাহসিকতার সঙ্গে তিনি এ বিষয়গুলো পরিচালনা করেছেন। সর্বোপরি কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে এ দেশে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা, এটা তো তার আমলেই হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আরেকটা বড় সাফল্য হলো পদ্মা সেতু। দেশে-বিদেশে এই পদ্মা সেতু নিয়ে যে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, তিনি সাহসের সঙ্গে তার মুখোমুখি হয়েছেন। পদ্মা সেতু তো এখন দৃশ্যমান। নিজেরা পদ্মা সেতু করব, এটা তো অবিশ্বাস্য ছিল। এখন এটা বাস্তব। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে চার লেন ব্যবস্থা- এটা আমরা ভাবতেই পারিনি। তিনি তা ভেবেছেন, আজ চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত চার লেন সড়ক হয়ে গেছে এবং উত্তরবঙ্গেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই সফলতাগুলোকে আমরা তেমনভাবে দেখি না, কিন্তু এগুলো উন্নয়নের একেকটি সোপান। সবশেষে বলব বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের কথা। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কতরকম চক্রান্তই না হয়েছে। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’- এর চেয়ে বড় ঘোষণা আর কী হতে পারে? সেই ভাষণকে ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই যে স্বীকৃতি পাওয়া বা আদায় করে নেওয়া, সেটা তো তার শাসন আমলেই হয়েছে।

সেই দিক থেকে আমি বলব, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার কন্যা শেখ হাসিনা তিনবারের শাসনে বাংলাদেশকে একটি অনুন্নত দেশ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত করেছেন। তার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।সুত্র: সমকাল