আলোচনায় সেই রোহিঙ্গা ‘গুপ্তচর’ পরিবার

সরওয়ার আজম মানিক::
রাতের অন্ধকারে শূন্যরেখা থেকে রোহিঙ্গা ‘গুপ্তচর’ পরিবারের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার পর বিষয়টি তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।

তবে এ ঘটনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার।

অবশ্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের উপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপশি তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি।

এরই মধ্যে তুমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া পরিবারটি গুপ্তচর ছিল।

তুমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাসরত রোহিঙ্গা আব্দুল করিম চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনার পর প্রভাবশালী রোহিঙ্গা নেতা ও ওই এলাকার চেয়ারম্যান আকতার আলম মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কথা বলে অন্যদের সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

‘অন্যরা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রুর কোনারপাড়ার নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নিলেও সে থাকতো পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক ইউপি মহিলা মেম্বারের ভাড়া বাসায়। সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের দেখভাল করার অজুহাতে বাংলাদেশের সব তথ্য মিয়ানমারে পাচার করে আসছিল।’

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা আব্দুস সালাম, রহিম উদ্দিন আর ফরিদুল আলম জানান, প্রায় সময় মিয়ানমারের মোবাইল নিয়ে আড়ালে গিয়ে কথা বলতেন আকতার। তার গতিবিধি আমাদের কাছে সন্দেহজনক ছিল। কিন্তু সে মিয়ানমারের চেয়ারম্যান হওয়ায় আমরা কিছু বলার সাহস পেতাম না। মূলত তার পুরো পরিবারটি ছিল মিয়ানমারের গুপ্তচর।

বাংলাদেশে-মিয়ানমার সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নেতা আমির হামজা বলেন, রাতের আঁধারে চুরি করে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া আকতার আলম ছিলেন রাখাইনের মংডু শহরের বলিবাজার এলাকার ‘তুমব্রু রাইট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সে সময়ে রাখাইনে একক আধিপত্য বিস্তার করত এই রোহিঙ্গা নেতা। তার সাথে রাখাইনের সেনাশাসিত বাহিনীর সদস্যদের সাথে ছিল দহরম মহরম সম্পর্ক।

‘গত বছরের ২৪ আগস্ট এর ঘটনার পর তার উপর কোন নির্যাতন না হলে ও এ দেশে থেকে খবর সংগ্রহের জন্য মিয়ানমারের সেনাদের নির্দেশে রোহিঙ্গা ঢলের সাথে তিনিও পালিয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে চলে আসে। কিন্তু নো-ম্যানস ল্যান্ডে বেশি দিন থাকেনি। ক্যাম্পের পাশ্ববর্তী ইউপি মহিলা মেম্বারের বাড়িতে ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিল। সাথে তার স্ত্রী সাজেদা বেগম (৪৫), মেয়ে শাহেনা বেগম (১২), ছেলে তারেক আজিজ (৭), মেয়ে তাহেরা বেগম (১০) এবং গৃহকর্মী শওকত আরা বেগম (২৩) সহ পরিবারের ৬ সদস্য। কিন্তু, রোববার সকালে জানতে পারি যে সে আমাদের সাথে প্রতারণা করে মিয়ানমারে ফেরত গেছে এবং ন্যাশনাল ভেরিফেকেশন কার্ড (এনভিসি) নিয়েছে’।

এ ঘটনাটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়াতে আসার পর সোমবার সারাদিন রোহিঙ্গাদের মাঝে এটি ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়।

উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের কাশেম মাঝী বলেন, এখন কাকে বিশ্বাস করবো? নিজের জাতির সাথে যে বেঈমানি করতে পারে সে কি মানুষ? এমন প্রশ্ন ছিল তার।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক গফুর উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের উপর গোয়েন্দা নজরদারী বাড়ানোর পাশাপশি তাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন জরুরি। মিয়ানমার প্রত্যাবাসন বিলম্ব করতে নানা তালবাহানা করবে। কিন্তু সরকার কে কৌশলে এগিয়ে যেতে হবে।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, এ ঘটনায় প্রত্যাবাসনে কোনো প্রভাব পড়বে না। উখিয়া ও টেকনাফের ১২টি ক্যাম্পে ১১ লাখেরও বেশি মিয়ানমারে নির্যাতিত নাগরিক অবস্থান করছেন। সেখানে একটি পরিবারকে তুলে নিয়ে মিয়ানমার কি বুঝাতে চায় তা বোধগম্য নয়।

‘তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে এক হাজার ৩ শ’ পরিবারের প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। ওই রোহিঙ্গা পরিবারগুলো প্রত্যাবাসনের আওতায় পড়ে না। এজন্য মিয়ানমার সরকারকে আগে থেকেই বলা হচ্ছে ওই পরিবারগুলোতে ফেরত নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা সবাইকে ফেরত না নিয়ে শুধু একটি পরিবারকে নিয়ে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, আমরা যত দ্রুত সম্ভব প্রত্যাবাসন শুরু করতে কাজ করে যাচ্ছি। সুত্র : চ্যানেল আই অনলাইন