আমাদের প্রিয় মৃদুল স্যার..

আমাদের প্রিয় মৃদুল স্যার। পুরো নাম মৃদুল কান্তি পাল। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উখিয়া উপজেলার অন্যতম বিদ্যাপীঠ মরিচ্যাপালং উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই সব প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকদের একজন, যাদের ভালবাসা, অান্তরিকতা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বিদ্যালয়টি আজ পঞ্চাশ বছরে পা দিয়ে সৃষ্টি করেছে এক গৌরবের ইতিহাস। যিনি নিজ মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে সৃষ্ট সেই গৌরবের অংশীভূত হয়ে ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীর হৃদয়ে বেঁচে আছেন মূর্তিমান এক জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে। আর এই কারনেই আজো কারো কাছে তিনি একজন অাদর্শ শিক্ষক, কারো কাছে একজন আদর্শ মানুষ। সবকিছু ছাড়িয়ে যেটা সবচেয়ে বড় পরিচয় তা হল, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর। যিনি নিজের সর্বস্ব এবং সর্বোচ্চটা দিয়ে হাজারো কীর্তিমান তৈরী করে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আলোকিত করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে গেছেন অবসরের আগ পর্যন্ত। সেই তাঁকে আজ জীবন সায়াহ্নে এসে বেদনার অশ্রুস্নাত নয়নে কষতে হচ্ছে শিক্ষকতা জীবনের প্রাপ্তি অ-প্রাপ্তির সমুদয় হিসেব! যে হিসেব কষতে গিয়ে জীবনের তেতাল্লিশটি বছর শিক্ষকতায় পার করা মহান এই মানুষটিকে আজ বলতে হচ্ছে শিক্ষকতায় আসাটা কি অপরাধ ছিল? নিঃসন্দেহে তা অপরাধ ছিলনা। বরং; অপরাধ আমাদের। অপরাধ সেই সব তথাকথিত সমাজপতি কিংবা শিক্ষাহীন শিক্ষানুরাগীদের, যারা শিক্ষার মিথ্যা অনুরাগী সেজে নিষ্কলঙ্ক বৈরাগীর ছদ্ম বেশে আত্মসাতের গোপন ফর্দ তৈরীর মহা পরিকল্পনায় পরিচালনা কমিটির পরিচালক হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকতে মরিয়া। আর এসমস্ত বিবেহীন মানুষদের বিরামহীন ষড়যন্ত্রের চতুরঙ্গ ফন্দিতে বন্ধি একজন অনুকরণীয় শিক্ষকের সম্মান এবং পেনশন নামক জীবনের শেষ সম্বলটুকু। অথচ কেবলমাত্র ভাললাগা থেকেই জীবনের যৌবনকালে শিক্ষকতায় আসা মানুষটি মানুষ গড়ার কারখানায় কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের স্বর্ণালী সময়টা। নিজের দক্ষ কারিগরি মহিমায় যে মানুষটা সমাজকে উপহার দিয়েছেন অনেক কীর্তিমান, সেই সমাজটা আজ কতইনা অকৃতজ্ঞ তাঁর প্রতি! মিথ্যা অপবাদে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় মত্ত তথাকথিত সমাজপতি এবং তাদের লেজুড় ভক্ত। কিন্তু যে মানুষটা একটি প্রতিষ্ঠানকে তিল তিল করে গড়ে তুলতে গিয়ে চোখের সামনেই পুরোটা জীবন কাটিয়ে দিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁর চেয়ে অন্য কারো দরদ বেশি হবে তাও কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? আমরা তা বিশ্বাস করিনা। যে মানুষটা সারা জীবন নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছেন, সে মানুষটা জীবনের শেষপ্রান্তে এসে অনৈতিকতার আশ্রয় নিবেন তা মানতে আমাদের বিবেক সায় দেয়না। আমরা যারা তাঁর ছাত্র হয়ে তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম, কেবল তারাই বুঝি তিনি কতটা ভাল শিক্ষক ছিলেন, কতটা আদর্শ নিয়ে জীবন সংগ্রামে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। সাদাসিধে জীবনযাপন করেছেন, কিন্তু কখনো দূর্নীতি, অন্যায় এবং অনৈতিকতার আশ্রয় নেননি। লোভের বশবর্তী হয়ে নিজের আদর্শ, সম্মান এবং রক্তে মিশে থাকা নৈতিকতা বিসর্জন দেননি। নিজের অান্তরিকতা এবং ভালবাসায় গড়া বিদ্যালয়টিকে দাঁড় করাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা এই শিক্ষক তাঁর সাহসিকতা দিয়ে যুগে যুগে খোলস পাল্টিয়ে নতুন রুপে অাবির্ভূত হওয়া শত মোড়লের ষড়যন্ত্র ভেঙ্গে দিয়েছেন অনেকবার। অথচ, সেই মানুষটাই ষড়যন্ত্রের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত জীবনের পড়ন্ত বেলায়! কি অপরাধ ছিল তাঁর? অপরাধী সাজিয়ে জনসমক্ষে আনা অভিযোগ গুলোর আদৌ কি কোন সত্যতা ছিল? নাকি অন্যকিছু? অন্যকিছু তো বটেই। তবে কি ছিল নেপথ্য কারন? সেসব বিষয় জানার আগে আসুন জেনে নিই মহান এই শিক্ষকের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতিঃ শ্রদ্ধেয় মৃদুল কান্তি পাল স্যার এর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলায়। তৎসময়ের আনোয়ারা উপজেলার বিখ্যাত পাল বংশের সুযোগ্য এই সন্তান ১৯৫১ সালে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলাধীন হারবাং ইউনিয়নে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শ্রী লাবণী মোহন পাল এবং মাতার নাম শ্রীমতি কল্যাণী পাল। উচ্চ শিক্ষিত পিতা শ্রী লাবণী মোহন পাল ছিলেন পাকিস্তান আমলের উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা এবং মা ছিলেন গৃহিণী। শ্রী লাবণী মোহন পাল এবং শ্রীমতি কল্যাণী পাল দম্পতির একমাত্র ছেলে সন্তান মৃদুল কান্তি পাল। চাকরীর সুবাধে তাঁর পিতা পুরো পরিবার নিয়ে জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থান করায় তাঁর বেড়ে উঠা এবং পরবর্তী জীবন যাপন সবকিছু হয়ে উঠে উখিয়া কেন্দ্রিক। প্রয়োজনের তাগিদে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে সাময়িক অবস্থান করলেও স্থায়ী হয়েছেন নিজের প্রিয় কর্মস্থল মরিচ্যাতেই এবং সেই থেকে তিনি এই সমাজেরই একজন।
শিক্ষাজীবনঃ পিতার সান্নিধ্যে থাকার সুবাধে উখিয়ার একটি স্কুলেই হয়েছিল তাঁর শিক্ষার প্রথম হাতেখড়ি এবং এখান থেকেই প্রাইমারী শিক্ষা শেষ করে অধিকতর ভাল শিক্ষার জন্য চলে যান তৎকালীন বার্মার রেঙ্গুন শহরে। সেসময় রেঙ্গুন শহর শিক্ষা ও ব্যবসার জন্য দক্ষিণ কক্সবাজারবাসীর কাছে খুবই প্রসিদ্ধ ছিল। রেঙ্গুন শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুলে পড়েন ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত। এরপর পারিবারিক প্রয়োজনে রেঙ্গুন থেকে চলে আসেন উখিয়ায়। কিন্তু উখিয়াতে স্থায়ী না হয়ে চলে যান কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও’তে। ভর্তি হন ঈদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং এই বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সহিত মেট্রিক পাস করে ভর্তি হন কক্সবাজার কলেজের সবেমাত্র অনুমোদন পাওয়া বিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৬৯ সালে এই কলেজ থেকে পাস করেন ইন্টারমিডিয়েট। এর পরেই নেমে পড়েন কর্মজীবনে। চাকরীর পাশাপাশি তিনি বি.এ সহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও পেশাগত ডিগ্রী অর্জন করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, ১৯৮১ সালে ‘ব্যাচেলর অব এ্যাডুকেশন’ (বি.এড) পরীক্ষার চুড়ান্ত ফলাফলে সমগ্র বাংলাদেশে মেধাতালিকায় ২০ তম এবং চট্টগ্রাম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করা।
কর্মজীবনঃ ইন্টারমিডিয়েট পাস করে কর্মের খোজে নেমে পড়া তুখোড় মেধাবী এই যুবক ১৯৭০ সালে পাকিস্তান আর্মির কমিশন রেংকে নিয়োগ পেয়েও পিতার অনীহার কারনে যোগদান করতে পারেননি। তৎকালীন পাকিস্তান আর্মি কর্তৃক পূর্বপাকিস্তানী তথা বাঙ্গালীদের উপর বিভিন্ন সময় নির্যাতন নিপীড়নের ঘটনায় এই বাহিনীর প্রতি বাঙ্গালীদের বিরূপ ধারনার কারনেই মূলত আর্মির চাকরীর প্রতি তাঁর পিতার অনীহা ছিল বলা ধারণা করা হয়। মূলতঃ শিক্ষকতার মত মহান পেশায় এসে মানুষ গড়ার সৌভাগ্য যার কপালে লেখা সে কি অন্য কোন পেশায় যেতে পারেন? তাইতো নিয়তির চিরন্তন সত্য তাঁকে টেনে নিয়েছিল শিক্ষকতায়। ১৯৭০ সালের ৪ঠা মার্চ সহকারী শিক্ষক হিসেবে সদ্য প্রতিষ্ঠিত মরিচ্যাপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করে শুরু করেছিলেন কর্মজীবন। মরিচ্যাপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করা নিয়ে একটা মজার ঘটনা ছিল, যেটা তাঁর মুখ থেকেই শুনা। ঐদিন যাচ্ছিলেন উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করতে। পথিমধ্যে দেখা হয় মরিচ্যাপালং উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক রত্নাপালং এর কৃতি সন্তান জনাব মরহুম আব্দুল হক স্যারের সাথে। অালাপচারিতায় সেদিন তাঁর মেধার গভীরতা অনুমান করতে জনাব মরহুম আব্দুল হক স্যারকে বেশি সময় নিতে হয়নি। কথায় বলে, রতনে রতন চিনে। আব্দুল হক স্যার তাৎক্ষণিক তাঁর গতিপথ পরিবর্তন করে নিয়ে যান মরিচ্যাপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে। উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিবর্তে যোগদান করেন মরিচ্যাপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর জীবনের তেতাল্লিশটি বছর পার করেন এই বিদ্যালয়ে। নিজ মেধা ও যোগ্যতায় সহকারী শিক্ষক থেকে হয়েছেন সিনিয়র শিক্ষক। শুধু তাই নয়। প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্বপালন করেছেন ১৯ বছর। যৌবকালে প্রথম শুরু করা কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটান এই বিদ্যালয় থেকেই। শিক্ষকতা জীবনে হাজারো পিছুটান থাকলেও একটি বারের জন্যও তিনি পিছপা হননি নিজের দায়িত্ব পালনে। অসংখ্য সুযোগ সুবিধা তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেও কখনো তিনি ভাবেননি বিদ্যালয় এবং নিজের ছাত্র-ছাত্রীদের ছেড়ে অন্য কোন পেশায় চলে যাবেন। অথচ, চাইলেই তিনি বিলাসী জীবন বেছে নিতে পারতেন। পারেননি কেবল জমে যাওয়া ভালবাসার কারনে। তাইতো তিনি মহান, তিনি অনুকরণীয় এক জীবন্ত আদর্শ। নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে আমাদের দিয়েছেন অনেককিছু, গড়েছেন ক্যাবিনেট ডিভিশনের যুগ্ম সচিব সোলতান আহমদের মত অনেক কীর্তিমান।
অন্য পরিচয়ঃ মেধাবী এই শিক্ষক শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন পল্লী চিকিৎসক হিসেবেও এলাকায় বেশ সমাদৃত। সুদীর্ঘকাল যাবৎ তিনি মরিচ্যাবাজার এলাকায় চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একটা সময় ছিল যখন এমবিবিএস ডাক্তার এবং যত্রতত্র হাসপাতালের সুযোগ সুবিধা ছিলনা সেসময় চিকিৎসা সেবার জন্য যে ক’জন পল্লী চিকিৎসকের উপর এলাকার মানুষ নির্ভরশীল ছিলেন তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে শিক্ষকতা থেকে অবসরে যাওয়া এই শিক্ষক পুরোটা সময় পার করছেন মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে।
সংগ্রামী জীবনঃ বার্মার রেঙ্গুন শহর থেকে কক্সবাজারের ঈদগাঁও শহরে যাওয়ার পর ছাত্রাবস্থায় ওখানকার একটা রেস্টুরেন্টে বেশ কিছুদিন চাকরীও করেছিলেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। রেস্টুরেন্টে চাকরী করলেও ঐ সময় তিনি নিজেকে লেখাপড়া থেকে দুরে সরিয়ে রাখেননি। চাকরী থেকে প্রাপ্ত বেতনের টাকা দিয়ে নিজে খেয়ে পরে চালিয়ে নিয়েছেন লেখাপড়া। এরকম বলা না বলা আরো অনেক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষটি একসময় শিক্ষকতায় এসে জয় করেছেন হাজারো প্রতিবন্ধকতা।
মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দুরন্ত এই যুবক দীর্ঘসময়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধে সময় দিতে না পারলেও দেশমাতৃকার প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছুকালের জন্য তিনি বন্ধুদের সাথে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ব্রীজ পাহারা দিয়ে দেশমাতৃকার জন্য অবদান রেখে হয়ে আছেন গৌরবময় অর্জনের অংশ। ইতিহাসের কোথাও হয়তো এসব এখন খোজে পাওয়া যাবেনা। কিন্তু তাঁর সত্যিকার সত্বার সাথে মিশে যাওয়া ইতিহাসের এই চরম সত্য তাঁকে আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও কুর্নিশ পাইয়ে দেবে সবসময়। কারন, পরিমানটা কিঞ্চিৎ হলেও মাহত্ব্যটা ছিল বিশাল। তাই আমাদের কাছে তিনি আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের অহংকার, আমাদের মহান শিক্ষাগুরু।
প্রিয় পাঠক, চাকরীর সুবাধে সুদুর চট্টগ্রামের আনোয়ারা থেকে এসে উখিয়ার মাটি ও মানুষের সাথে মিশে যাওয়া দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট বালকটি হাটি হাটি পা পা করে শৈশব কৈশোর পেরিয়ে পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে একই ভাবে মিশে গিয়েছিলেন এখানকার মাটি ও মানুষের সাথে। শুধুমাত্র ভালবাসার কারনে শত সুযোগ থাকা সত্বেও ছেড়ে যাননি এই পরিবেশটাকে। জীবন জীবিকার পাশাপাশি ভালবাসার তাগিদে বেছে নেওয়া সদ্য প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে অক্লান্ত পরিশ্রম ও ভালবাসার মাধুরী মিশিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলে সে প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে গেছেন সফলতার স্বর্ণ শিখরে। সেই সফলতা একদিন দু’দিনে অাসেনি। জীবনের পুরো তেতাল্লিশটি বছর ব্যয় করেছেন এর পেছনে। পিছুটান কিংবা কোন কঠিন বাস্তবতাও তাঁকে টলাতে পারেনি। সবকিছুকে পেছনে ফেলে একজন আদর্শ শিক্ষকের তকমা গায়ে মেখে বিদায়ের চিরন্তন বিষাদময় সিঁড়ি বেয়ে আজ তিনি জীবন সায়াহ্নে। কিন্তু যাবার বেলায় সেই মহান মানুষটাকে এই সমাজ যোগ্য সম্মান এবং প্রাপ্যটুকু দিতে পারেনি। সময়ের আগে অনেকটা জোর করে বিদায় করে, অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হল নিজের হাতে গড়া প্রিয় প্রতিষ্ঠান থেকে। সরে যাওয়ার জন্য চতুর্মুখী হুমকি দমকি মোকাবেলা না করে জন্ম থেকেই সাদাসিধে এই মানুষটি নিরবে নিভৃতে চলে গিয়ে সেদিন প্রমাণ করেছিলেন তিনি নেওয়ার জন্য আসেননি, দেওয়ার জন্যই এসেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এত এতকিছু দেওয়ার পরও কেন তাঁকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হল? এর পেছনে কে বা কারা দায়ী? বিষয়টা তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি যে বক্তব্য দেন তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপঃ
খুব সম্ভবত ২০০৮ সালের শেষ দিকে ঘটনার সূত্রপাত। তখন তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেশ দক্ষতা ও সুনামের সহিত দায়িত্বপালন করছিলেন। ঐসময় তৎকালীন পরিচালনা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে অতীতের ধারাবাহিকতায় যথারীতি স্কুল পরিচালনা কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নিয়মানুযায়ী অভিভাবকদের ভোটে নির্বাচিত এবং কয়েকটি ক্যাটাগরিতে সিলেক্টেড সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় পূর্ণাঙ্গ সদস্য বিশিষ্ট্য সাধারন কমিটি। তৎকালীন ম্যানুয়াল অনুযায়ী সভাপতি নির্বাচন করার এখতিয়ার ছিল সর্বসম্মত প্রার্থী না পেলে কেবল শিক্ষাবোর্ডের হাতে। শিক্ষাবোর্ড এলাকার যে কোন জনপ্রতিনিধি কিংবা গ্রহণযোগ্য কোন শিক্ষানুরাগী বা সমাজসেবককে পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দিতেন। এই ক্ষেত্রে অবশ্য শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাচারিতার অাশ্রয় না নিয়ে বরং স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং কমিটির সদস্য সচিবের পরামর্শমতে সভাপতি নিয়োগ দেওয়ার রেওয়াজ অনুসরন করতেন। আর নির্বাচিত এবং সিলেক্টেড সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে কিংবা অন্যকোন গ্রহণযোগ্য উপায়ে নির্বাচিত হতেন সহসভাপতি। সে বার সকলের মতামতের ভিত্তিতে সভাপতি নির্বাচিত না হওয়ায় ঐ পদটি শিক্ষাবোর্ডের সিদ্ধান্তের জন্য খালি রাখা হয়।যথারীতি সহসভাপতি পদের জন্য জনাব ইসলাম মেম্বার এবং স্কুলের সাবেক সিনিয়র শিক্ষক জনাব মোহাম্মদ ইসহাক (ইসহাক স্যার) প্রতিদ্বন্দ্বতীতা করেন। নির্বাচনে সাধারন সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে জনাব ইসলাম মেম্বার বেশি ভোট পেয়ে সহসভাপতি পদে বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ও কমিটির সদস্য সচিব মৃদুল কান্তি পাল (মৃদুল স্যার) উক্ত পদের জন্য জনাব ইসলাম মেম্বারের নাম সুপারিশ করে অনুমোদনের জন্য শিক্ষাবোর্ডে পাঠান। ইতিমধ্যে আওয়ামীলীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পরপরই যাবতীয় স্কু্ল পরিচালনা কমিটি যেটা যে অবস্থায় থাকুক না কেন তার কার্যকারিতা বিলুপ্ত করা হয়েছে মর্মে নতুন পরিপত্র জারি করে। ফলে ঐসময় সভাপতি পদটি শুন্য থাকে আবার অন্যদিকে, সহসভাপতি হিসেবে জনাব ইসলাম মেম্বারের অনুমোদন পাওয়া হয়নি, বরং, রয়ে যায় দোদুল্যমান অবস্থায়। দীর্ঘসময় বিষয়টার নিষ্পত্তি না হওয়ায় জনাব ইসলাম মেম্বার দায়িত্বপালনের সুযোগ চেয়ে আদালতে মামলা করেন। অন্যদিকে আরেক নির্বাচিত সদস্য জনাব আবু নাছের এই মর্মে স্কুল ও শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ এবং কমিটির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা টুকে দেন যে,সভাপতি পদে তিনি বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও অনুমোদনের জন্য তার নাম শিক্ষাবোর্ডে পাঠানো হয়নি। কিন্তু প্রত্যক্ষ স্বাক্ষীদের মতে বাস্তবতা ছিল, ঐসময় তিনি সভাপতি পদের জন্য নির্বাচন করেন তবে সর্বসম্মত না হওয়ায় ম্যানুয়াল অনুসারে তার নাম বোর্ডে প্রস্তাব করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষাবোর্ড তখন আবু নাছেরের করা মামলা পরিচালনার দায়িত্ব অর্পন করেন প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি পাল (মৃদুল স্যার) এর উপর এবং বোর্ডের নির্দেশনামতে একটা দীর্ঘসময় তিনি জনাব আবু নাছেরের করা মামলাটি পরিচালনা করেন। মামলাটি যেহেতু একটি প্রতিষ্ঠান এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছিল তাই তিনি বোর্ডের অনুমোদনে মামলার যাবতীয় খরচাদি স্কুলের ফান্ড থেকেই খরচ করতেন। দুই মামলা চলমান সময়ের প্রায় বছর দেড়েক পর আদালত জনাব ইসলাম মেম্বারের করা মামলার রায় দেন এবং আবু নাছেরের করা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া এবং পরবর্তী কমিটি গঠন না হওয়া অবদি তাকে সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্বপালনে সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিলে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু ম্যানুয়াল অনুযায়ী কমিটির বৈধতার জন্য অবশ্যই বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন। এই কমিটির উপর যেহেতু বোর্ডের অনুমোদন ছিলনা এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে অন্য আরেকটি মামলা চলমান ছিল সেহেতু অভিজ্ঞদের মতে এই কমিটি পরিপূর্ণ বৈধ কমিটি ছিলনা। প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি পাল (মৃদুল স্যার) এর অভিযোগ মতে, জনাব ইসলাম মেম্বার দায়িত্বগ্রহণ করার পর থেকেই অনেকটা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে তাঁর উপর নানাভাবে কলঙ্কলেপনের চেষ্টা করতে থাকেন। তাঁর বেতন সীটে স্বাক্ষর না করে অন্যায়ভাবে তাঁর বেতন ভাতাদি উত্তোলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। শুধু তাই নয়, আবু নাছেরের করা মামলা বোর্ডের নির্দেশমতে পরিচালনা করতে গিয়ে স্কুলের ফান্ড থেকে তিনি যে টাকা খরচ করেছিলেন তাও বিভিন্ন অজুহাতে অনুমোদন দিতে গড়িমসি করেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, কোরাম পূর্ণ না করেও তিনি একাধিকবার সভার আয়োজন করে অনৈতিক এবং নিয়মহীন ভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরিমধ্যে আদালত আবু নাছেরের করা মামলার রায় ঘোষনার দিন ধার্য্য করেন। মামলার রায় ঘোষনার ঠিক তিনদিন পূর্বে জনাব ইসলাম মেম্বারের নেতৃত্বাধীন অনুমোদনহীন কমিটি টাকা অাত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ এনে সম্পূর্ণ বেইনী, অগণতান্ত্রিক এবং অনৈতিকভাবে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি পাল (মৃদুল স্যার) কে প্রথমে বাধ্যতামূলক এবং পরে তা সংশোধন করে সাময়িক বরখাস্ত করেন। ফলে তাঁর বেতন ভাতাদি মাসে মাসে ব্যাংকে জমা হলেও কমিটির স্বাক্ষর না পাওয়ায় তিনি তা উত্তোলন করতে পারেননি। সবকিছু মিলিয়ে এসব ছিল একজন নিষ্কলঙ্ক এবং আদর্শ শিক্ষকের প্রতি চরম অন্যায়, চুড়ান্ত অবিচার। দুঃখের বিষয় ছিল, সেদিন তাঁর পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। তিনি সরে গিয়ে নিয়েছিলেন আইনের আশ্রয়। অন্যায়ভাবে বহিস্কারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে লড়ে যান একা। সেসময় এই সমাজ তাঁর পাশে না থাকলেও দেশের স্বচ্ছ আইন, বিজ্ঞ আদালত সত্যের পাশে ছিল। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত মামলা খারিজ করে দিয়ে তাঁকে নির্দোষ ঘোষনা করে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে পুনরায় স্বপদে বহাল করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন তাঁর সমুদয় পাওনা মিটিয়ে দিতে। কিন্তু মামলার রায়ে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেও আর স্বপদে ফিরতে পারেননি। মামলা চলাকালীন সময়ে তাঁর চাকরীর মেয়াদ শেষ হলে তিনি অবসরে চলে যান। ইতিমধ্যে তাঁর পরিচালনাধীন অন্য মামলা যেটি আবু নাছের বাদী হয়ে করেছিলেন সেটিকেও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে খারিজ করে দিয়ে অাদালত মহান এই শিক্ষকের পক্ষে রায় দেন। যেটিকে ঐসময় অনেকে সত্যের জয় বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ মামলা মোকাদ্দমা পর্ব শেষে এডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা আসলে ঐসময় উখিয়া-টেকনাফের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব আলহাজ্ব আব্দুর রহমান বদি’র সুপারিশে শিক্ষাবোর্ড হলদিয়া পালং ইউনিয়নের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব আমিনুল হক আমিনকে সেই এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। নিয়োগ পেয়ে তিনি আদালতের নির্দেশমতে প্রধান শিক্ষক মৃদুল কান্তি পাল (মৃদুল স্যার) এর যাবতীয় বকেয়া হিসাব চুড়ান্ত পূর্বক তাতে স্বাক্ষর করে পরিশোধের পক্ষে বিহীত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পূর্বে ব্যাংকে জমে থাকা সমুদয় টাকা ফেরৎ চলে যাওয়ায় শুধুমাত্র তাঁর মেয়াদকালীন ঐ তিনমাসের বেতন ভাতাদি ঠিকমত পেয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য যে, জনাব আমিন তিনমাস দায়িত্বপালন শেষে বিদায় নেওয়ার প্রাক্ষালে পুনরায় মৃদুল কান্তি পাল স্যারের সমুদয় পাওনা পরিশোধের পক্ষে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে গেলেও পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় কমিটির দায়িত্বে আসা জনাব ইসলাম মেম্বার তা পুনরায় আটকে দেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। ফলে আদালতের নির্দেশ থাকা সত্বেও সাবেক এই প্রধান শিক্ষক অদ্যাবধি তাঁর পাওনা টাকা সমূহ ফেরৎ পাননি। চলছে একের পর এক নিত্যনতুন তালবাহানা। এসব তালবাহানার পেছনে ছুটতে ছুটতে আজ তিনি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। এখন সবকিছুকে ছেড়ে দিয়েছেন নিয়তির হাতে। কিন্তু এমনতো কথা ছিলনা। সম্মান দিতে পারিনি কিংবা জানিনি, সেটা আমাদের দূর্ভাগ্য। তাই বলে একজন শিক্ষকের প্রাপ্য বেতন ভাতা সমেত শেষ সম্বল খ্যাত পেনশনটুকুও আটকে দিতে হবে? এ কোন সভ্য সমাজে বাস করছি আমরা? গুণীজনকে সম্মান দিতে না জানা লোকদের নিয়ে আমরা কিভাবে গুণী তৈরী করব? উত্তর এবং প্রত্যাশা নিষ্প্রয়োজন। কারন, দোষ আমাদের। আমাদের অদূরদর্শিতার কারনেই আজ এমন শিক্ষাহীন ব্যক্তিরা শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নোংরামি করার সুযোগ পাচ্ছে, ভাল মানুষীর আড়ালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যবসা করার গোপন অভিলাষে সংঘবদ্ধ হয়ে শিক্ষক নামের মানুষ গড়ার কারিগরদের চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করে প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে যে, অদ্যাবদি ভুল করেও স্কুলে যাদের পা পড়েনি কিংবা পড়লেও স্কুলের গন্ডি পেরোনো যাদের সম্ভব হয়নি তারাই আজ শিক্ষানুরাগী! স্কুল দরদী! স্কুল পরিচালনা কমিটির হর্তাকর্তা! এমন শিক্ষাহীন তথাকথিত শিক্ষানুরাগীদের কাছে আমরা কিইবা আশা করতে পারি? প্রত্যাশার চেয়ে প্রয়োজন যেটুকু ভাল রয়েছে সেটাকে টিকিয়ে রাখা। এর জন্য প্রয়োজন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখে দেওয়া। অন্যথায় এই সমাজে কোন শিক্ষিত মানুষ শিক্ষকতার মত মহান পেশায় নিজেদের জড়াতে চাইবেন না, সমাজ থেকে গুণীজনরা নিজেদের আড়াল করে রাখবেন। এতে করে ক্ষতিগ্রস্থ হবে সমাজ, ক্ষতিগ্রস্থ হবে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম। যেমনটি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, “যেখানে গুণীজনদের সম্মান করা হয়না, সেখানে গুণীজন জন্মায়না।”
কোন লেখায় কারো কষ্ট পাওয়ার চেয়ে ভুক্তভোগীর অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারাটাই সেই লেখনীর স্বার্থকথা। যদিও এই লেখাটা ব্যক্তিগতভাবে কারো চরিত্র হননের জন্য নয়। আমাদের দুঃখটা এই কারনে যে, যে মানুষটা তেতাল্লিশটি বছর শিক্ষকতা করে সমাজকে আলোকিত করেছেন, সেই মানুষটাকে যাবার বেলায় আমরা এতটুকু সম্মান দিতে পারিনি! আমরা কি অকৃজ্ঞ নয়? অবশ্যই অকৃতজ্ঞ। সময় এসেছে সেই অকৃতজ্ঞতা মুছনের। এটা আমাদের দায়িত্বও বটে। অন্যথায় আমরা অপরাধী হয়ে থাকব। কারন, মানুষটা আজ বড্ড বেশি মানবেতর সময় কাটাচ্ছেন। ঘরে তাঁর অসুস্থ স্ত্রী। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালাতে গিয়ে এখন অনেকটাই নিঃস্ব। প্রতিদিন তাঁর ফেসবুক আইডিতে কোন না কোন বেদনাদায়ক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে সেই সব স্ট্যাটাসে কারো কাছে সাহায্য না চাইলেও তাঁর করুন অবস্থা বুঝতে কষ্ট হয়না। আমরা যারা তাঁর ছাত্র তাদের কষ্টটা একটু বেশিই বৈকি। যে মানুষটা আমাদের জন্য এতকিছু করেছেন তাঁর প্রতি কেন আমরা এত অবিচার করব? স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা কি এসব সহ্য করবেন? যদি আমরা নিজেদেরকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় তাহলে আমার বিশ্বাস তাঁর বিরোধী পক্ষও তাঁর পাশে দাঁড়াবে। প্রয়োজন শুধু ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করা। আসুন সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে আমরা সেই মানুষটার পাশে দাঁড়ায়, যে মানুষটা নিজেকে ভেঙ্গে আমাদের গড়েছেন। তাঁর প্রাপ্য পেনশনের টাকার পরিমানটা হয়তো আপনার আমার চোখে খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু এমনওতো হতে পারে, সেই টাকাটা দিয়েই তিনি তাঁর ধুকতে থাকা পরিবার নিয়ে পুনরায় উঠে দাঁড়াতে পারে। তাই আমরা কি পারিনা তাঁর তেতাল্লিশ বছরের দিয়ে যাওয়া অমূল্য কিছুর ঋণ পরিশোধ করতে? চাইলে পারি। কিন্তু চাইবেন কিনা তা আপনাদের বিবেকের বিষয়।
শেষ করার আগে আমি তাঁর হাতে গড়া কৃতি ছাত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ক্যাবিনেট ডিভিশনের মাননীয় যুগ্ম সচিব জনাব সোলতান আহমদ স্যারের প্রতি সবিনয় অনুরোধ করব বিষয়টা যদি তাঁর দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে তিনি তাঁর শিক্ষকের সম্মান এবং প্রাপ্য পেনশনের টাকাটা পাওয়ার ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
আশার কথা হল, মাননীয় ক্যাবিনেট সচিব মহোদয় আমাদের এলাকারই সন্তান। যতটুকু জানি, ন্যায় নীতির ব্যাপারে তিনি সবসময় অটল। তাঁর এলাকার একজন প্রবীণ শিক্ষক অসম্মানীত হবেন কিংবা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন তাঁর জানা সত্বে সেটার প্রতিকার হবেনা তা আমরা বিশ্বাস করিনা। তাই তাঁর প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ, বিষয়টার প্রতি সুদৃষ্টি দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব একজন শিক্ষকের প্রতি সম্মান দেখাবেন, তাঁর সমুদয় পাওনা পরিশোধের বিহীত ব্যবস্থার নির্দেশ দেবেন। আমরা জানি, একজন ক্যাবিনেট সচিবের কাছে এটা খুবই নগন্য। তাই আমাদের বিশ্বাস, তিনি অবগত হওয়া মাত্রই বিষয়টার নিষ্পত্তি হবে।
তাছাড়া মাননীয় ক্যাবিনেট সচিবের ছোট ভাই অধ্যক্ষ শাহ আলম হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি একজন শিক্ষকও বটে। তাই শিক্ষক হয়ে শিক্ষকের মর্যাদা, সম্মান এবং প্রাপ্য অধিকারের বিষয়ে তারও ছাড় দেওয়ার কথা নয়। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, তিনি সম্প্রতি সেই স্কু্লের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন। তাই বিষয়টা এখন তাঁর কাছেও খুবই নগন্য। তাই তাঁর কাছে আমাদের অনুরোধ থাকল, একজন প্রবীণ শিক্ষকের প্রাপ্য সম্মান এবং অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।
প্রিয় পাঠক, কেবলমাত্র একজন মহান শিক্ষকের অসম্মান হতে দেখে, তাঁকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে দেখে মনোবেদনা থেকেই আমার এ লেখা। কাউকে ছোট করার জন্য এটা করিনি। আমার মনে হয়েছে, এই সমাজ তাঁর প্রতি অবিচার করেছে। যেটা কখনো কাম্য ছিলনা। তাঁর চোখের পানি নিশ্চিতভাবে আমাদের অভিশপ্ত করবে। তাই আসুন, যাবতীয় প্রতিশোধের স্পৃহা পরিহার করে দেরীতে হলেও তাঁর সম্মান এবং পেনশন নামের শেষ সম্বলটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে কিছুটা হলেও সমাজকে দায়মুক্ত করি। মনে রাখবেন, একজন শিক্ষক কেবল একজন মানুষ নন, বরং; সুনাগরিক গড়ার মহান কারিগর। তাই শিক্ষকের প্রতি আমাদের মনোভাবটা হউক বাদশা আলমগীরের মত।

লেখক : মোঃ জামাল উদ্দিন, ব্যাংকার ও মৃদুল কান্তি পাল স্যারের ছাত্র।

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব উখিয়া নিউজ- এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য উখিয়া নিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।