আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে…

লাইফস্টাইল ডেস্ক::
মহারানি ভিক্টোরিয়া, চার্লস ডারউইন এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের মধ্যে একটি বিশেষ মিল রয়েছে। তারা আত্মীয়ের মধ্যেই বিবাহসম্পন্ন করেন! যদিও ডারউইন মানব সম্প্রদায় সম্পর্কে একটু বেশিই জ্ঞানী বলে দাবি করেছিলেন, কিন্তু বিয়ের বেলায় আসলেই কি তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? আত্মীয় সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে কি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ক্ষতির কারণ? হ্যাঁ, কারণ বংশপরম্পরায় এতে করে জিনগত সমস্যা দেখা দেয়, এর ফলে অনেক পরিবারেই দেখা দেয় জেনেটিক ডিজঅর্ডার। নতুন বংশধরদের অনেকের মধ্যে দৃষ্টি, শ্রবণ ও মূক প্রতিবন্ধিতা দেখা দিতে পারে।

অথচ রক্ত সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে না করলেই এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো না। যে সব জিন এই জেনেটিক ডিজঅর্ডারের জন্য দায়ী (ডিফেকটিভ জিন), সেগুলো সাধারণত প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকে। অর্থাৎ আমাদের দুই সেট ক্রোমোজোমের মধ্যে যদি একটিও ডিফেকটিভ হয় তাহলে সুস্থ জিনের জন্য রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। একই পরিবারে বিয়ে হলে সন্তানের মধ্যে দু’টিই ডিফেকটিভ জিন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। ফলে পরবর্তী প্রজন্মে সুস্থ (একটি ডিফেকটিভ জিন) এবং প্রতিবন্ধী (দুটিই ডিফেকটিভ জিন)— এই দুই ধরনের সন্তানই দেখা যায়।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে জন্মগ্রহণকারী সন্তানের জিনগত অস্বাভাবিকতার হার সাধারণ শিশুদের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। অস্বাভাবিকতার মধ্যে নবজাতকের অতিরিক্ত আঙুল গঁজানোর মতো সমস্যা থেকে শুরু করে হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র বা মস্তিষ্কের গঠন-প্রক্রিয়ায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে। অবশ্য সার্বিক বিবেচনায় এ ধরনের অস্বাভাবিকতার হার খুবই কম বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

ad

এমন অনেক রোগ রয়েছে, যা বংশানুক্রমিকভাবে বিস্তার ঘটিয়ে চলে। থ্যালাসেমিয়া এমন একটি রোগ। এটি জিনবাহিত রোগ। থ্যালাসেমিয়ার রোগী ছাড়াও এর জিন বাহক মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। তারা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বা থ্যালাসেমিয়া বাহক হিসেবে চিহ্নিত। থ্যালাসেমিয়া রোগের কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও তাদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার জিন সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এ সব ব্যক্তি সারাজীবন স্বাভাবিক সুস্থ জীবন যাপন করে থাকেন।

কিন্তু দু’জন থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট বা বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের সন্তানদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। থ্যালাসেমিয়া অত্যন্ত কষ্টদায়ক একটি রোগ। থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুর শরীরে লোহিত কণিকা পূর্ণ আয়ুস্কালের পূর্বেই ভেঙ্গে যায়। ফলে শিশু তীব্র রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভুগতে থাকে। নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমেই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশনের মাধ্যমে শিশুকে পরিপূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি চিকিৎসা পদ্ধতি।

অথচ একটু সচেতন হলেই থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম দেয়া থেকে বিরত থাকা যায়। বিয়ের পূর্বে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বর ও কনের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার জিন রয়েছে কি-না তা দেখে নিলেই অনাকাঙ্খিত এ সমস্যা এড়ানো যায়। এক সময় গ্রীস ছিল সবচেয়ে বেশি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের দেশ। বিয়ের পূর্বে বর ও কনের রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার বাহক শণাক্তকরণের মাধ্যমে তারা আজ পুরোপুরিভাবে থ্যালাসেমিয়ামুক্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে।

বিয়ের পূর্বে বা পরে বর ও কনের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি কনের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয় ও বরের পজিটিভ হয় এবং গর্ভধারনের পর বাচ্চার রক্তের গ্রুপ পজিটিভ হয় তবে সেক্ষেত্রে বাচ্চার শরীরে লোহিত কণিকা দ্রুত ভেঙ্গে ভয়াবহ রক্ত স্বল্পতা ও জন্ডিস হতে পারে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর অ্যান্টি-ডি ভ্যাক্সিন নেয়ার মাধ্যমে এই বিপর্যয় রোধ করা যেতে পারে।